এই মানচিত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের শীতকালীন আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর (El Niño) সাধারণ প্রভাবগুলো তুলে ধরে। প্রশান্ত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী এল নিনো গড়ে ওঠার কারণে মিশিগানে সম্ভবত উষ্ণ শীতকাল দেখা যাবে/<br> NOAA
ডেট্রয়েট, ৫ সেপ্টেম্বর : মিশিগানে এবারের শীতে প্রচুর সাদা ও নরম তুষারপাতের সম্ভাবনা কম। এর পরিবর্তে বৃষ্টি, স্লিট (বরফমিশ্রিত বৃষ্টি) ও তুলনামূলক উষ্ণ তাপমাত্রার পাশাপাশি ‘পোলার ভর্টেক্স’—মেরু অঞ্চল থেকে আসা তীব্র শীতল বায়ুপ্রবাহের—সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের প্রধান জুলিয়া কোল।
এর পেছনে প্রশান্ত মহাসাগরে ‘এল নিনো’র শক্তিশালী প্রভাবকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোলের মতে, এই দূরবর্তী জলবায়ুগত ঘটনা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার মতো বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলে দেখা দিতে পারে খরা, বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমের মতো শুষ্ক এলাকায় হতে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যা। সম্ভবত পুরো বিশ্বেই রেকর্ড পরিমাণ উষ্ণতা অনুভূত হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৭ সালে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে ২০২৭ সাল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সেন্ট্রাল মিশিগান ইউনিভার্সিটির আর্থ অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক সায়েন্সের অধ্যাপক ডারিয়া ক্লুভার বলেন, এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত অঞ্চলগুলোর তালিকায় মিশিগান নেই। তবে এ রাজ্যে তুলনামূলক উষ্ণ শীত পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তার মতে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ দিক থেকে আসা উষ্ণ জেট স্ট্রিম উত্তর দিকে সরে মিশিগানের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে তুষারের পরিবর্তে বৃষ্টি ও বরফমিশ্রিত বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শীতকালীন ঝড়ের ঝুঁকি বাড়লে বাইরে শীতকালীন বিনোদন ও কর্মকাণ্ডের সুযোগ কমে যেতে পারে।
ক্লুভার বলেন, “আমি একজন ক্রস-কান্ট্রি স্কিয়ার। সেদিনই স্কি করার সরঞ্জামগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবলাম—এসব নামিয়ে ওয়াক্স লাগানোর আদৌ প্রয়োজন হবে কি না। কারণ স্কি করার জন্য পুরু তুষারের স্তর প্রয়োজন।”
কোল জানান, অতীতে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে মিশিগানে শীতকালীন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়েছিল।
তিনি বলেন, “আমরা যখন হিমাঙ্কের কাছাকাছি তাপমাত্রায় থাকি, তখন কয়েক ডিগ্রির এই পরিবর্তনও বেশ বড় মনে হয়। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের সামান্য ওপরে বা নিচে ওঠানামা করতে পারে, আর এমন পরিস্থিতি বেশ অস্বস্তিকর।”
তবে এল নিনোর প্রভাবে মিশিগানে উষ্ণ শীতের সম্ভাবনার পাশাপাশি ভিন্ন ধরনের আবহাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানান কোল। এল নিনো মেরু অঞ্চলের জেট স্ট্রিমে পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যার ফলে মেরু অঞ্চলের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস দক্ষিণ দিকে নেমে মিশিগানে পৌঁছাতে পারে। এই ধরনের তীব্র শীতল বায়ুপ্রবাহই ‘পোলার ভর্টেক্স’ নামে পরিচিত।
কী এই এল নিনো?
এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত বাণিজ্য বায়ু (ট্রেড উইন্ড) প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের উষ্ণ পানিকে ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে, অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে ফিরে আসতে শুরু করে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটে।
সাধারণত কয়েক বছর পরপর এল নিনোর আবির্ভাব ঘটে। এর অন্যতম প্রভাব হলো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রে এর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব সাধারণত পশ্চিমাঞ্চলে দেখা যায়। সেখানে এল নিনোর প্রভাবে ঝড়ের গতিপথ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে সরে যেতে পারে, যে অঞ্চলটি সাধারণত তুলনামূলক শুষ্ক।
কোল জানান, বছরের এই সময় পর্যন্ত রেকর্ড করা এল নিনো ঘটনাগুলোর মধ্যে বর্তমান এল নিনো ইতোমধ্যে অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং সামনে আরও রেকর্ড ভাঙতে পারে।
তিনি বলেন, “পূর্বাভাসগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী, অথবা দ্বিতীয় শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে। আমরা এমন একটি পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হতে পারে। এর অর্থ হলো এর প্রভাবও তুলনামূলকভাবে আরও তীব্র হতে পারে।”
কোলের মতে, এল নিনোর শক্তি যত বাড়ে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও এর প্রভাব তত বেশি বিস্তৃত হয়। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিক আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
ক্লুভার জানান, এল নিনো সাধারণত ডিসেম্বরের দিকে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়।
তিনি বলেন, “এটি সম্ভবত একটি রেকর্ড-ভাঙা ঘটনা হতে চলেছে। আমাদের আবহাওয়া মডেলগুলোও তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে।”
মিশিগানের সম্ভাব্য আবহাওয়া সম্পর্কে ক্লুভার বলেন, “আমরা জানি কী ধরনের পরিস্থিতি আশা করা যায়—উষ্ণ শীতকাল এবং তুলনামূলক কম তুষারপাত।বিষয়টি কারও ভালো লাগতে পারে, আবার কারও নাও লাগতে পারে।”
জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোর তীব্রতা বাড়ায়
বিজ্ঞানীরা ১৯৮০-এর দশক থেকেই লক্ষ্য করে আসছিলেন যে এল নিনো ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। তবে সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের কোল ও তাঁর সহকর্মীরা গবেষণায় দেখেছেন, শিল্প বিপ্লবের সময়—মানুষ যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বিভিন্ন কাজে কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করে—তখন থেকেই এল নিনোর তীব্রতা আরও বাড়তে শুরু করেছে। তাঁদের এই গবেষণার ফলাফল গত মাসে ‘সায়েন্স’ (Science) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের প্রবাল থেকে ‘কোর স্যাম্পল’ বা নলাকার নমুনা সংগ্রহ করেন। এল নিনোর প্রভাব এই অঞ্চলে বিশেষভাবে প্রবল। প্রবাল প্রতিবছর নতুন খনিজ স্তর তৈরি করে এবং বছরে প্রায় এক থেকে দুই সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
বিজ্ঞানীরা প্রবালের প্রতিটি স্তরের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে অতীতের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও এল নিনোর তীব্রতার তথ্য পুনর্গঠন করেন। এভাবে তাঁরা প্রায় ৯০০ বছরের সমুদ্রের তাপমাত্রা ও এল নিনোর পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ পান। গবেষণার তথ্য থেকে দীর্ঘ সময়ের জলবায়ুগত পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনোর শক্তি বৃদ্ধির সম্পর্কও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।
কোল বলেন, প্রবালের নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা “সুদূর অতীতের দিকে তাকানোর সুযোগ পেয়েছেন। এর ফলে সময়ের সঙ্গে তাপমাত্রার ওঠানামা এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কতটা ছিল, তা বোঝা সম্ভব হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “১৮৫০ সালের আগের সময়কে আমরা প্রাক্-শিল্পযুগ হিসেবে বিবেচনা করি। সে সময় তাপমাত্রার ওঠানামার পরিসর ছিল তুলনামূলকভাবে কম ও স্থিতিশীল। এরপর তা বাড়তে শুরু করে এবং ১৯৮০ সালের পর থেকে এই পরিবর্তনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।”
কোলের মতে, এসব তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য চরম ও বিপর্যয়কর আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর তীব্রতাও বাড়তে পারে। “ঘটনাটি প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে, নাকি মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাবে ঘটছে—তা নিশ্চিত করতে আমরা সম্ভাব্য সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। আমাদের সাধ্যমতো প্রাকৃতিক কারণগুলোকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি,” বলেন কোল। “এখন আমাদের কাছে যে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তা হলো মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এল নিনোর তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
তিনি বলেন, পরিস্থিতিটি উদ্বেগজনক হলেও এর সমাধানের পথ অজানা নয়।
“বিষয়টি আশ্চর্যজনক মনে হলেও আসলে অপ্রত্যাশিত নয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা কীভাবে কমানো যায়, তা আমরা জানি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তাও আমাদের জানা। জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় নবায়নযোগ্য শক্তি অনেক বেশি সাশ্রয়ী। ফলে এই সমস্যার সমাধানের পথ সম্পর্কেও আমাদের পরিষ্কার ধারণা রয়েছে,” বলেন কোল।
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :