হ্যামট্রাম্যাক, ২০ সেপ্টেম্বর : ‘পাঠক সম্রাট’ প্রভুপাদ শ্রীল নিত্য গোপাল গোস্বামী মহারাজ বলেছেন, “নাম বিনা কলিকালে নাই আর ধর্ম। সর্ব মন্ত্র সার নাম- এই শাস্ত্র মর্ম।”
তিনি বলেন, প্রত্যেক যুগের একটি নির্দিষ্ট যুগধর্ম রয়েছে। যে যুগে যে ধর্মীয় আচরণ পালন করলে সর্বশ্রেষ্ঠ ফল লাভ করা সম্ভব, তাকে যুগধর্ম বলা হয়।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে—
“কৃতে যদ্ ধ্যায়তো বিষ্ণুং
ত্রেতায়াং যজতো মখৈঃ।
দ্বাপরে পরিচর্যায়াং
কলৌ তদ্ হরিকীর্তনাত্॥”
তিনি বলেন, সত্যযুগের যুগধর্ম হলো ধ্যান- বিশেষ করে বিষ্ণুর ধ্যান। ত্রেতাযুগের প্রধান ধর্ম যজ্ঞ। দ্বাপরযুগে যুগধর্ম হলো সেবা ও অর্চনা। আর কলিযুগের যুগধর্ম হচ্ছে হরিনাম সংকীর্তন।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যুগধর্মের পাশাপাশি অন্য যুগগুলোতে কি যজ্ঞ, হরিনাম বা ধ্যান ছিল না? কলিযুগে কি ধ্যান নেই? ত্রেতাযুগে কি ধ্যান ছিল না? সত্যযুগে কি যজ্ঞ ছিল না? সত্যযুগে কি হরিনাম সংকীর্তন ছিল না?—অবশ্যই ছিল। তবে যে যুগে যে ধর্ম প্রধান, সেই যুগের সেই ধর্ম পালন করলেই সর্বশ্রেষ্ঠ ফল লাভ করা যায়। তিনি গতকাল বিকেলে শহরের রাধাকৃষ্ণ টেম্পলে আয়োজিত এক ভক্ত সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, একজন কৃষক যখন মাঠে চাষ করতে যান, তখন তিনি সর্বাধিক ফসলের আশা করেন। কেউ যখন লটারির টিকিট কেনেন, তিনি প্রথম পুরস্কারের আশা করেন। আবার কেউ যখন কোনো কর্মে প্রবেশ করেন, তখন সেই কর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ ফল লাভের প্রত্যাশা করেন। ঠিক তেমনি সাধন-ভজনের ক্ষেত্রেও সর্বশ্রেষ্ঠ ফল লাভ করাই যুগধর্মের উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, সত্যযুগের যুগধর্ম বিষ্ণুর ধ্যান। তবে সত্যযুগে যজ্ঞও ছিল। পুরাণে বর্ণিত আছে, মহর্ষি ত্বষ্টা যজ্ঞ করেছিলেন এবং সেই যজ্ঞ থেকে বৃত্রাসুরের সৃষ্টি হয়েছিল। তাহলে কি তারা যজ্ঞ করেননি? অবশ্যই করেছেন এবং যজ্ঞের ফলও লাভ করেছেন। কিন্তু সেই ফল ছিল না সর্বশ্রেষ্ঠ ফল।
তিনি বলেন, ত্রেতাযুগের যুগধর্ম যজ্ঞ। তবে ত্রেতাযুগে কি ধ্যান ছিল না? অবশ্যই ছিল। একইভাবে দ্বাপরযুগের যুগধর্ম সেবা ও অর্চনা। কিন্তু দ্বাপরযুগেও যজ্ঞের প্রচলন ছিল। আমরা দেখতে পাই, মহর্ষি শৌনক তাঁর দশ হাজার ঋষি-শিষ্যকে নিয়ে যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেছিলেন। ঠিক তেমনি কলিযুগেও যজ্ঞ করা যাবে, ধ্যান করা যাবে, যোগাভ্যাসও করা যাবে। সবই করা সম্ভব। কিন্তু কলিযুগের প্রধান ধর্ম হলো হরিনাম সংকীর্তন।
তিনি বলেন, “নাম বিনা কলিকালে নাই আর ধর্ম। সর্ব মন্ত্র সার নাম- এই শাস্ত্র মর্ম।” তিনি আরও বলেন, ভক্তির মাধ্যমে কর্ম, যোগ ও জ্ঞান সবকিছুরই পরিপূর্ণতা আসে। মানুষ যে কর্মই করুক না কেন, যদি হরিনাম উচ্চারিত না হয়, তাহলে সেই কর্মের কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “যেমন বাড়িতে লক্ষ্মীপূজা হবে, কালীপূজা হবে, শিবপূজা হবে। পূজা শেষে পুরোহিত মশাই যে মন্ত্র উচ্চারণ করেন ‘যদ্ অসঙ্গং কৃতং কর্ম জ্ঞাতাজ্ঞাতং তৎ সর্বং সঙ্গতং যাতু হরিনাম কীর্তনাত্।’ অর্থাৎ, জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে, হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে।”
তিনি বলেন, “এখানে পূজা হরির পূজা নয়, নারায়ণের পূজা নয়, কৃষ্ণের পূজা নয়, বিষ্ণুর পূজাও নয়। এটি কালীর পূজা, লক্ষ্মীর পূজা, বিশ্বকর্মার পূজা, দুর্গার পূজা, গণেশের পূজা কিংবা কার্তিকের পূজা। কিন্তু হরিনাম উচ্চারণ না করা পর্যন্ত সেই কর্মের পূর্ণ ফল লাভ হয় না।”
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য দেব-দেবীর পূজার ক্ষেত্রেও হরিনামের প্রয়োজন রয়েছে। তবে কলিযুগে কেউ যদি হরিনামকে আশ্রয় করেন, তাহলে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো সাধন হতে পারে না।
তিনি বলেন, শুদ্ধ বা অশুদ্ধ উচ্চারণে, এমনকি যথাযথভাবে উচ্চারিত না হলেও, ভগবানের নাম মুখে উচ্চারিত হলে বা শ্রবণপথে প্রবেশ করলে তা মানুষকে মুক্তির পথে নিয়ে যেতে সক্ষম।
তিনি বলেন, “একবার যদি হরিনাম করা যায়, তাহলে পরে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব। তবে নামের আশ্রয় নিয়ে যদি কেউ পাপ থেকে মুক্ত হয়ে হরিনাম করতে পারে, সেটিই মূল কথা।”
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “কেউ যদি মনে করে, তাহলে আর চিন্তা কী? পাপ করে যাও, পাশাপাশি হরিনামও করো। দিনের শেষে ঘুমানোর আগে বলবে—‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে; হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে’—তারপর ঘুমিয়ে পড়বে। তাহলে কি সারাদিনের সমস্ত পাপ ঝেড়ে ফেলা যাবে? পরদিন ঘুম থেকে উঠে কি একজন সম্পূর্ণ পবিত্র সাধু হয়ে যাওয়া যাবে?” তিনি বলেন, “না, না, না। এভাবে হরিনাম করা নাম-অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। একে বলা হয়—‘নাম বলে পাপের প্রবৃত্তি’।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, হরিনামের মাহাত্ম্যকে পাপ করার অনুমতি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং হরিনামের মাধ্যমে পাপাচার থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং শুদ্ধ জীবনযাপনের চেষ্টা করাই ভক্তির উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, “কলিযুগ-পাবন অবতারী শ্রীগৌরসুন্দর কৃপা করে কলিযুগকে এই অপূর্ব পরিণাম প্রদান করেছেন। আমাদের কর্তব্য হলো নামের সেবা করা, নামের মাহাত্ম্য গ্রহণ করা এবং গভীর প্রেম ও ভক্তির সঙ্গে হরিনাম গ্রহণ করা।
হরিনাম করলে কী হবে, কী ফল পাওয়া যাবে এসব চিন্তা ত্যাগ করে শুধু নামের জন্য নাম করতে হবে, ভগবানকে প্রীত করার জন্য নাম করতে হবে। এটাই হচ্ছে কলিযুগের শ্রেষ্ঠ সাধন এবং মানবজন্ম সফল করার প্রকৃত কর্তব্য। সকলের নামের প্রতি রুচি সৃষ্টি হোক, সকলের হৃদয়ে নামের প্রতি প্রেম জাগ্রত হোক এটাই রাধা-গোবিন্দের চরণে এবং নিতাই-গৌরাঙ্গের চরণে আমাদের প্রার্থনা।”
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

নিজস্ব প্রতিনিধি :