ডেট্রয়েট, ২০ সেপ্টেম্বর: ‘পাঠক সম্রাট’ প্রভুপাদ শ্রীল নিত্য গোপাল গোস্বামী মহারাজ বলেছেন, “ভাগবতী কথার অর্থ ভক্তির কথা। ভক্তি একটি সাধনমাধ্যম- ভগবানের করুণা ও কৃপা লাভ এবং তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার অন্যতম পথ।” তিনি বলেন, ভগবানের কৃপা লাভের জন্য শাস্ত্রে নানা পথের সন্ধান দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভক্তিমার্গ, জ্ঞানমার্গ, যোগ ও কর্মকাণ্ড। জ্ঞানচর্চা ও ব্রহ্মের উপাসনার মাধ্যমে যেমন তাঁর কৃপা লাভের চেষ্টা করা হয়, তেমনি ভক্তিও ভগবানকে পাওয়ার একটি সাধনমার্গ।
প্রভুপাদ শ্রীল নিত্য গোপাল গোস্বামী মহারাজ বলেন, “কলিযুগের জীবের জন্য ভক্তিকে শুধু একটি সাধনমাধ্যম বললে ঠিক হবে না; এটি সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনমাধ্যম। আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা কলিযুগে জন্মগ্রহণ করেছি, আবার দুর্ভাগ্যও বটে।” তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্য এই কারণে যে, কলিযুগের পরিবেশ মানুষের সুখ ও প্রশান্তি লাভের অনুকূল নয়। আর সৌভাগ্য হলো এই যুগেই ভক্তি ও হরিনামের মাধ্যমে অতি সহজে পরম প্রাপ্তি লাভ করা সম্ভব।”
তিনি আজ রোববার সন্ধ্যায় ডেট্রয়েট দুর্গা টেম্পলে শ্রীশ্রী হরিভক্তি প্রচারিণী সভা, মিশিগানের উদ্যোগে আয়োজিত এক ধর্মীয় সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “শ্রীমদ্ভাগবতে কলিযুগের দোষ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। কলিযুগ কেমন? দোষের সমুদ্র, দোষের খনি। প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি লাভের মতো ভালো গুণ যেন একটিও নেই। কিন্তু এর মধ্যেও একটি মহৎ গুণ রয়েছে। সেটি হলো ‘কীর্তনাদেব কৃষ্ণস্য মুক্তসঙ্গঃ পরং ব্রজেত্।’ অর্থাৎ, শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণের হরিনাম কীর্তনের মাধ্যমে সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে পরম প্রাপ্তি লাভ করা সম্ভব।”
তিনি বলেন, “এই সুযোগ অন্য কোনো যুগে এত সহজ ছিল না। সত্যযুগে এত সহজ ছিল না, ত্রেতাযুগে এত সহজ ছিল না, এমনকি দ্বাপরযুগেও এত সহজ ছিল না। ভগবান যুগধর্ম প্রবর্তন করেছেন যুগের মানুষের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী। যে যুগে মানুষের যে ধরনের সাধন-ভজনের অধিকার ও সামর্থ্য, সেই অনুযায়ী ধর্মের পথও তিনি নির্ধারণ করেছেন।”
তিনি উপস্থিত ভক্তদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা বিদেশে আছেন। তবে কিছুক্ষণের জন্য ভাবুন, আপনারা সবাই দেশে অবস্থান করছেন। এখন চিন্তা করে দেখুন- যদি মন্ত্রতন্ত্রের এত কঠোর বিধিনিষেধ থাকত, তাহলে আপনারা কি সহজে সাধন-ভজন করতে পারতেন?”
তিনি বলেন, “যদি সাধন-ভজনে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার থাকত- এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না; সামান্য ভুল হলেই অপরাধ হয়ে যাবে- তাহলে আপনারা কি সাধন-ভজন করতে পারতেন? কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ছাড়া সাধনায় অধিকার পাওয়া যেত না। দীর্ঘ সময় ধরে সাধন-ভজন করতে হতো। দেশে কতজনই বা ঠাকুরঘরে বসে মনকে একাগ্র করে ভগবানের সঙ্গে লীন হওয়ার চেষ্টা করেছেন?”
তিনি আরও বলেন, “এসব যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল পূর্ববর্তী যুগগুলোর সাধন-ভজনে। কিন্তু কলিযুগে ভগবান মানুষের সামর্থ্য ও যোগ্যতার কথা বিবেচনা করে সহজ সাধনপথ হিসেবে হরিনাম সংকীর্তনের পথ দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, “কলিযুগের সৌভাগ্য হলো- আমরা এমন একটি যুগে জন্মগ্রহণ করেছি, যেখানে অত পরীক্ষা দিতে হয় না, অত নিয়ম-কানুনের কড়াকড়ি নেই, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার নেই, মন্ত্রতন্ত্রের কঠোর বিধিনিষেধ নেই। শরীরের ওপর কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনেরও প্রয়োজন নেই। হৃদয় নিয়ে এত কঠিন সাধনা করার প্রয়োজন নেই। কারণ এসব কঠোর সাধন-পদ্ধতি থাকলে কলিযুগের জীবের উদ্ধার সহজ হতো না।”
তিনি বলেন, “এই কারণেই ভগবান নির্দেশ দিয়েছেন- ‘কীর্তনাদেব কৃষ্ণস্য মুক্তসঙ্গঃ পরং ব্রজেত্।’ শ্রীগুরুচরণের আশ্রয় গ্রহণ করে যদি হরিনাম কীর্তন করা যায়, তাহলে মানুষ কী লাভ করবে? সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করবে এবং পরমার্থ-প্রেম পর্যন্ত অর্জন করতে পারবে।” তিনি আরও বলেন, “যে প্রেমধন লাভ করলে ভগবানকে খুঁজে বেড়াতে হয় না; ভগবান নিজেই সেই প্রেমিক ভক্তকে খুঁজে নেন।”
এর আগে মন্দিরে পৌঁছালে ভক্তরা গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধায় ফুলের মালা ও পুষ্পবৃষ্টি করে প্রভুপাদ শ্রীল নিত্য গোপাল গোস্বামী মহারাজকে অভ্যর্থনা জানান। পরে কীর্তনের মাধ্যমে তাঁকে মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর বক্তব্যের আগে ও পরে হরিনাম সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। গত দুই দিন তিনি মিশিগানে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। এ সময়ে তিনি মিশিগানের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত কয়েকটি ধর্মীয় সভা ও অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং ভক্তদের উদ্দেশে ধর্মীয় বক্তব্য প্রদান করেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

নিজস্ব প্রতিনিধি :