আজ শনিবার হ্যামট্রাম্যাক হাই স্কুলে আয়োজিত অভিষেক অনুষ্ঠানে শহরের নতুন মেয়র হিসেবে শপথ নেন মুহিত মাহমুদ। তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান ৩১তম ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের প্রধান বিচারক অ্যালেক্সিস জি. ক্রট/Photo : Clarence Tabb Jr, The Detroit News
হ্যামট্রাম্যাক, ৮ নভেম্বর : এক বছর ধরে চলা নির্বাচনী বিরোধের পর অবশেষে হ্যামট্রাম্যাকের নতুন মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন মুহিত মাহমুদ।
রোববার বিকেলে হ্যামট্রাম্যাক হাই স্কুলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি অ্যাডাম আলহারবির স্থলাভিষিক্ত হলেন। গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর আলহারবিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল।
তবে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী বিরোধের অবসান ঘটেনি। আলহারবির আইনজীবী জানিয়েছেন, এ নিয়ে আইনি বিরোধ এখনো চলমান রয়েছে।
শপথ গ্রহণের পর দেওয়া বক্তব্যে মাহমুদ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেন। স্থানীয় বাসিন্দা, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিসহ কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে তিনি শহরের উন্নয়নে তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
মাহমুদ বলেন, সিটি কাউন্সিল, নগর প্রশাসন, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তিনি হ্যামট্রাম্যাককে এগিয়ে নিতে চান। তাঁর অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে জননিরাপত্তা জোরদার, রাস্তাঘাট ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি।
এ ছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন, জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহের জন্য অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও তদবির চালানোর কথা জানান তিনি।
মাহমুদ বাসিন্দাদের কথা শোনা, নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়া এবং সবার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণের প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, “আমাদের বাসিন্দারা এমন একটি প্রশাসন পাওয়ার যোগ্য, যারা তাঁদের কথা শুনবে, সাড়া দেবে এবং গৃহীত পদক্ষেপগুলো কার্যকর করবে।”
মেয়র তাঁর বক্তব্যে হ্যামট্রাম্যাকে বসবাসরত বাংলাদেশি, ইয়েমেনি, পোলিশ, রুশ, আফ্রিকান-আমেরিকানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “আমাদের বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। আমাদের পটভূমি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আমাদের সবার প্রত্যাশা অভিন্ন। আমরা একই এলাকায় বসবাস করি এবং সবাই নির্ভরযোগ্য নাগরিক সেবা, উন্নত বিদ্যালয় ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ভবিষ্যৎ চাই।”
বাসিন্দাদের একে অপরের ভিন্নতা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পাশাপাশি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
মাহমুদ বলেন, “কিছু বিষয়ে আমাদের মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে সব সময় বাসিন্দাদের স্বার্থকেই সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে।”
মেয়র প্রো-টেম আবু মুসা মুহিত মাহমুদের শপথ গ্রহণকে হ্যামট্রাম্যাকের জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি জানান, মাহমুদ তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু। তাঁরা একই গ্রামে বেড়ে উঠেছেন, একই কলেজে পড়াশোনা করেছেন এবং একসঙ্গে রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন।
মুসা নগরবাসী ও শহরের নেতাদের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আসুন, আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাই। আমি আপনাদের সঙ্গে আছি। আমরা সবাই মিলে এই শহরকে গড়ে তুলব।”
প্রায় এক বছর ধরে চলা নির্বাচনী বিরোধ ও আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন মুহিত মাহমুদ।
অন্যদিকে, আলহারবির আইনজীবী নাবিহ আয়াদ মুহিত মাহমুদের শপথ গ্রহণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর যুক্তি, হ্যামট্রাম্যাকের স্বীকৃত মেয়র হিসেবে অ্যাডাম আলহারবি এখনো দায়িত্বে রয়েছেন। পৃথক আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাঁকে সরিয়ে অন্য কাউকে মেয়রের পদে বসানো সম্ভব নয়।
আয়াদ জানান, তাঁর মক্কেল ৩৭টি ব্যালটসহ সব অনুপস্থিত ভোটের (অ্যাবসেন্টি ব্যালট) পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া বসবাসের যোগ্যতা নিয়ে করা একটি আপিল বর্তমানে মিশিগান কোর্ট অব আপিলসে বিচারাধীন রয়েছে। মাহমুদের শপথ গ্রহণের বৈধতা এবং বিতর্কিত অনুপস্থিত ব্যালট নিয়ে অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রক্রিয়াকেও আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানান তিনি।
আয়াদ বলেন, “এখানেই বিষয়টির শেষ নয়। সামনে আরও বিস্তৃত আইনি লড়াই হতে যাচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, তাঁর মক্কেল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে চান। নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, প্রকৃত বিজয়ীই যেন মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
আয়াদ বলেন, “তিনি কেবল ন্যায়সংগত ও সঠিক সমাধান চান। তিনি চান, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।”
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের প্রাথমিক গণনায় অ্যাডাম আলহারবি ১১ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী ঘোষিত হয়েছিলেন।
তবে নির্বাচনের পরদিন শহরের ক্লার্কের কার্যালয়ে ৩৭টি অব্যবহৃত বা গণনা না করা ব্যালট পাওয়া যায়। এসব ব্যালট গণনা করা হবে কি না, সে বিষয়ে ওয়েইন কাউন্টি বোর্ড অব ক্যানভাসার্সে আলোচনা হয়। কিন্তু বোর্ডের সদস্যদের ভোট ২-২ ব্যবধানে সমান হওয়ায় কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে ব্যালটগুলো গণনার বাইরে থেকে যায়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আলহারবি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মধ্যে মাহমুদ ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত প্রাথমিকভাবে বোর্ডের সিদ্ধান্তের পক্ষেই রায় দেয়। ফলে ৩৭টি ব্যালট গণনা করা হয়নি।
এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন মাহমুদ। ২০২৬ সালের মার্চে মিশিগান কোর্ট অব আপিলস সার্কিট কোর্টের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। এরপর আলহারবি মিশিগান সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। তবে সর্বোচ্চ আদালত মামলাটি শুনানির জন্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে আপিল আদালতের রায় বহাল থাকে এবং মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টে ফেরত পাঠানো হয়।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিচারক ক্যাথলিন ম্যাকার্থি বোর্ড অব ক্যানভাসার্সকে ৩৭টি ব্যালট গণনার নির্দেশ দিয়ে আদেশ জারি করেন। সে অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর অতিরিক্ত ব্যালটগুলো গণনা করা হয়। এতে মাহমুদ ২ হাজার ৮৯ ভোট পেয়ে আলহারবির ২ হাজার ৭৭ ভোটকে ছাড়িয়ে যান। অর্থাৎ, ১২ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে যান মাহমুদ।
তবে নতুন এই নির্বাচনী ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়িত হওয়ার প্রক্রিয়া তখনো বাকি ছিল। কারণ, মাহমুদ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য কি না, তা নিয়ে আলহারবির দায়ের করা আরেকটি মামলা তখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ওই মামলায় আলহারবির অভিযোগ ছিল, মাহমুদ শহরে বসবাসের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেননি। গত ৩০ অক্টোবর বিচারক এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি করেন, যা মাহমুদের মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পথ সুগম করে।
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :