ওয়ারেন, (মিশিগান) ১৫ ফেব্রুয়ারি : সৈয়দ মোঃ ফয়সল সম্প্রতি হবিগঞ্জ–৪ (মাধবপুর–চুনারুঘাট) আসনে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এই বিজয় কেবল তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার প্রতিফলন নয়; বরং মানুষের পাশে থাকা ও জনসেবায় নিবেদিত এক দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি। তাঁর এই গৌরবময় অর্জনে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।
সৈয়দ মোঃ ফয়সল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জয়-পরাজয়—উভয়কেই তিনি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেছেন। শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, সবসময় তিনি মাধবপুর ও চুনারুঘাটের সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের সেবা করে গেছেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। বিনয়, সরলতা, পরোপকারিতা ও স্বচ্ছতা এই চারটি গুণ তাঁর চরিত্রকে করেছে স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ।
দেশে অবস্থানকালে আমি এই গুণাবলির প্রত্যক্ষ সাক্ষী। একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্ন থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সময়পর্বে তাঁর সঙ্গে আমার আত্মিক ও পেশাগত সম্পর্কের এক গভীর অধ্যায় রচিত হয়েছিল, যার উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে ছিল দৈনিক হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস পরিবার। আমার অফিসটি শহরের ডাকঘর এলাকায় একটি তিনতলা ভবনের তৃতীয় তলায় ছিল। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তিনি যখনই হবিগঞ্জে আসতেন, আমার অফিসে না এসে যেতেন না। অনেক সময় তিনতলার সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে হাপিয়ে উঠতেন। অথচ বিশাল সম্পদের অধিকারী এই মানুষটির মুখে তখনও থাকত এক নির্ভার হাসি। শ্বাস সামলে মৃদু রসিকতায় বলতেন, “আপনার অফিসে উঠতে উঠতে মনে হয়, যেন পরীক্ষায় পাস করেই তবে সাক্ষাৎ মেলে!” তাঁর কথায় অভিযোগ ছিল না; ছিল স্নেহমিশ্রিত আন্তরিকতা।
অর্থবিত্ত, প্রভাব বা সামাজিক মর্যাদা কোনোটিই তাঁকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। বরং সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠার কষ্টটুকুও যেন তিনি গ্রহণ করতেন সম্পর্কের মূল্য হিসেবেই। তৃতীয় তলার ছোট্ট কক্ষে বসে আমরা কখনো রাজনীতি, কখনো সমাজ, কখনো ব্যক্তিজীবনের গভীরতা নিয়ে আলোচনা করেছি। আজও মনে হয়, সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠা প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাঁর বিনয়ের প্রতীক। শিখরে থেকেও মাটির কাছাকাছি থাকার এক নীরব অঙ্গীকার।
আরেকটি স্মৃতি বিশেষভাবে মনে পড়ে। বয়সে ছোট হলেও তিনি আমাকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। এই ছোট্ট সম্বোধনের মধ্যেও ছিল গভীর আন্তরিকতা ও মানবিক সৌজন্য। তিনি এলেই অফিসের পরিবেশ এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠত। দৈনিক হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস পরিবারের সেই দিনগুলো আজ স্মৃতির অ্যালবামে রঙিন হয়ে আছে। সময়ের স্রোতে কর্মক্ষেত্র ও অবস্থান বদলেছে, কিন্তু সেই সময়ের শিক্ষা ও মানবিক বন্ধন আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে।
১৯৮০-এর দশকে তাঁর পরিবার রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল। তখন তাঁর ভাই মরহুম সৈয়দ মোঃ কায়সার কৃষি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় আমি দৈনিক জনতা-এর হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতাম। প্রায়শই তিনি হবিগঞ্জে এলে তাঁর সফরসঙ্গী হতাম আমি এবং প্রয়াত সাংবাদিক শফিকুর রহমান মনি। সেই সফরগুলো কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; ছিল মানুষের গল্প, জনসেবার প্রতিশ্রুতি এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে আন্তরিক প্রয়াস। সেই সফরগুলো আমাকে শিখিয়েছিল, রাজনীতিবিদ হতে হলে শুধু ক্ষমতা নয়, হৃদয়ও দরকার। এই অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, মাধবপুরের এই পরিবারটি রাজনৈতিক ও মানবিক চরিত্রে সবসময় উদার, সহানুভূতিশীল এবং সহমর্মী।
সৈয়দ মোঃ ফয়সল কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি একজন মানবিক মানুষ। মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা অটুট। তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন, আন্তরিক ব্যবহার এবং স্বচ্ছ চরিত্র তাঁকে করেছে অনন্য। তিনি প্রমাণ করেছেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার অলংকার নয়; এটি মানুষের আস্থা ধারণের এক গুরুদায়িত্ব। তাঁর চলার পথ ছিল পরিমিত, সংযত ও মূল্যবোধনির্ভর। প্রতিটি সিদ্ধান্তে তিনি মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন; প্রতিটি বক্তব্যে ফুটে উঠেছে সমাজের প্রতি তাঁর গভীর সংবেদনশীলতা ও দায়বদ্ধতা।
তাঁর রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়, সমন্বয়ের; বিভাজনের নয়, ঐক্যের। ভালোবাসা, নৈতিকতা ও সহমর্মিতাই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূলভিত্তি। তিনি দেখিয়েছেন, একজন প্রকৃত নেতা নির্বাচনী বিজয়ের জন্য নয়, মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ার জন্য কাজ করেন। তাঁর কর্মধারা আগামী প্রজন্মের কাছে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
আমি তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও অব্যাহত কর্মময় জীবনের জন্য আন্তরিক প্রার্থনা জানাই। তাঁর প্রজ্ঞা, সাহস ও মানবিক নেতৃত্ব আমাদের সমাজকে আরও আলোকিত ও সুসংগঠিত করুক এই কামনাই করি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

চিন্ময় আচার্য্য :