পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। দিনটি নববর্ষ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা এবং তাৎপর্যে বিভাসিত। বিচিত্র বর্ণ-রাগে অনুরঞ্জিত। দিনটি জীবনের প্রাত্যহিক বলয় ছাড়িয়ে ঊর্ধচারী। প্রতিদিনের জীর্ণ, আত্মসর্বস্ব, ক্ষুদ্রতার আগল ভেঙে সুদূরব্যাপ্ত তার মহিমা। এককথায় আমাদের জাতীয় উৎসব নববর্ষ আবহমান বাংলার অপ্রতিম বৈভব।
নববর্ষের সাথে চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যিক সম্পর্ক নয়নের মাঝে নয়নের পাতার মতই অবিচ্ছেদ্য। বুঝি এ কারণেই চির যাচিত সুন্দরের অন্বেষায় নববর্ষের উপযোগিতা, গুরুত্ব, নান্দনিকতা বহুমাত্রিক।
বর্তমানে বৈশাখ মাসে নববর্ষের সূচনা ধরা হলেও প্রাচীনকালে নববর্ষ শুরু হত অগ্রহায়ণ মাসে। এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে অগ্রহায়ণী নক্ষত্রের নাম থেকে। প্রচলিত লোক বিশ্বাস হল, অগ্রহায়ণী নক্ষত্রের উদয়ে ধান পাকে। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির 'পূজা পার্বণ' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষ উদযাপন করা হত। কবে থেকে নববর্ষ উদযাপিত হত এ বিষয়ে মতভেদ প্রচুর। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ যখন শান্তিনিকেতনে বৈশাখ মাসে নববর্ষ উৎসবের আয়োজন করেন তখন থেকেই উৎসবের বর্ণাঢ্যতা সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অধিকতর তাৎপর্যমণ্ডিত হতে থাকে। বাঙালির সাংস্কৃতিক মন মননে, চেতনায় তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী একথা অনস্বীকার্য।
"আমরা হয়ত অনেকেই জানি না মিলাদ মাহফিল, বয়াতির আসর, জারি, সারি, মরসিয়া, পুঁথি পাঠের মজলিস জমিয়ে প্রজা সাধারণ ও কৃষককূলকে সম্পৃক্ত করে পহেলা বৈশাখের উৎসব প্রথম সূচনা করেছিলেন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাবক। তাঁরই নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের ফসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি বাংলা ভাষায় মিলাদ শরিফের প্রথম প্রবর্তক। "
নববর্ষ নামক বৃক্ষের অনুষ্ঠানমালা নানাবিধ শাখা প্রশাখায় পল্লবিত এবং প্রসারিত। তবে প্রধান তিনটি অনুষ্ঠান হল পুণ্যাহ, হালখাতা ও মেলা। সুপ্রাচীন ঐতিহ্যে স্নাত মেলাকে বলা যায় নববর্ষের প্রাণভোমরা। মেলায় লোক জীবন ও লোকসংস্কৃতির বহুমাত্রিকতা শতধারায় উৎসারিত হয়। শুধু সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক সামাজিক প্রভৃতি দিক থেকেও মেলার গুরুত্ব অপরিমেয়। আবহমান বাংলার লোকমেলা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত।
ধর্মীয় মেলা, ধর্ম নিরপেক্ষ মেলা। ধর্মনিরপেক্ষ মেলার আসরে বৈশাখী মেলা গর্ব গৌরবে সমুন্নত। ভিন্নমাত্রায় ব্যঞ্জনায়িত।দৃষ্টিনন্দন লোক শিল্পের প্রাচুর্য মেলার প্রাণ। কুটিরশিল্পজীবী গ্রাম বাংলার মানুষের সহজাত শিল্প প্রতিভা, সৃজন নৈপুণ্য, বর্ণজ্ঞান, কল্পনাশক্তির উৎকর্ষ, নিষ্ঠা, শ্রম, একাগ্রতা ইত্যাদি ইত্যাদির ধারক বাহক হিসেবে মেলার স্থান অনন্য উচ্চতায়। পাশাপাশি লোকসাহিত্যের নানাবিধ চিত্তরঞ্জন আয়োজনও মেলার অপরিহার্য বৈভব। মেলাকে কেন্দ্র করে শিশু মন আনন্দের পাখা মেলে ।
আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, সামগ্রিক জীবনচর্যা, সমাজ, অর্থনীতি ইত্যাদি ইত্যাদির উৎস মূল অবশ্যই গ্রামীণ মৃত্তিকায় প্রোথিত। নববর্ষের বিচিত্র অনুষঙ্গের আশ্রয়ে প্রমূর্ত হয় আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। যার মূল সুর মানব কল্যাণ।
প্রকৃতপক্ষে বাংলা নববর্ষ বাঙালির জীবনায়নে অনির্বাচ্য এক আনন্দবাঁশি। মানুষের বেশির ভাগ উৎসব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্মভিত্তিক। বাংলা নববর্ষই একমাত্র সর্বজনীন উৎসব। সে উৎসবের আনন্দধারায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অবগাহন করে। এই অবগাহনে জাগেপ্রাণ। জাগে উজ্জীবনী শক্তি। আশারা তখন নতুন আলোয় চোখ মেলে। কল্যাণকামী স্বপ্নরা আঁকে সাত সুরের মধুরিমা আলিম্পন।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, "প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র দীন, একাকী। কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ। সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ। সেদিন সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ... " আমাদের বিবেচনায় এই বৃহতের মধ্যেই মেলার প্রাণধারা বহমান । হাজার বসন্তের পুষ্প -ঐশ্বর্যে বর্ণিল। স্বার্থপরতা, দৈন্য, আত্মপ্রেম ইত্যাদি তুচ্ছতা থেকে অন্ধকার অন্তঃকরণে আলোক সম্পাতের মাধ্যমেই আসে নববর্ষ পালনের প্রকৃত সার্থকতা।
নববর্ষের চেতনা বিষয়ে প্রাণের কবি, সাম্যের কবি, মানুষের কবি, অসাম্প্রদায়িক কবি, আলোর কবি নজরুলের উক্তি প্রণিধানযোগ্য। নতুন কে আবাহন জানিয়ে উচ্চকণ্ঠে কবি বলেন,
"ঐ নূতনের কেতন ওড়ে/
কালবোশেখির ঝড়/
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।"
এ জয়ধ্বনি সত্যের।
আবাহন সুন্দরের।
উচ্চারণ কল্যাণের।
কলোচ্ছ্বাস বাংলা নববর্ষের।
তথ্যসূত্র
নববর্ষ ও বাংলা লোকসংস্কৃতি
আবুল কালাম মঞ্জুর মোর্শেদ।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর
ড. আশরাফ সিদ্দিকী।
রবীন্দ্র রচনাবলি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
নজরুল রচনাবলি
কাজী নজরুল ইসলাম।
লোকসাহিত্য
ড. আশরাফ সিদ্দিকী ।
বাংলা সংস্কৃতির শতবর্ষ (সম্পাদনা পরিষদ) সম্পাদক করুণাময় গোস্বামী।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

জাহান আরা খাতুন :