ডেট্রয়েট, ১০ জুলাই : অনেক আমেরিকানের কাছে জোনাকি (যা কিছু অঞ্চলে ‘লাইটনিং বাগ’ নামেও পরিচিত) গ্রীষ্মের অন্যতম পরিচিত প্রতীক। উষ্ণ সন্ধ্যায় এদের মিটিমিটি আলো প্রকৃতিতে এক অনন্য সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।
জোনাকি হলো ‘ল্যাম্পাইরিডি’ (Lampyridae) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এক ধরনের ছোট গুবরে পোকা। অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণে কাজ করা আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ‘জার্সেস সোসাইটি’-র তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৫টিরও বেশি প্রজাতির জোনাকি রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উত্তর আমেরিকার ১৮টি প্রজাতির জোনাকি রয়েছে, যা মোট প্রজাতির প্রায় ১৪ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রায় হুমকির মুখে রয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রজাতিকে ‘চরমভাবে বিপন্ন’, কিছু ‘বিপন্ন’ এবং কিছু ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জার্সেস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক স্কট হফম্যান ব্ল্যাক এক ইমেইল বার্তায় বলেন, “যদিও কিছু সাধারণ ও অভিযোজনক্ষম জোনাকি প্রজাতির অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো থাকতে পারে, তবে বৈজ্ঞানিক মহলে এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে যে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিকভাবে জোনাকির সংখ্যা কমছে।”
জোনাকি আসলে কী এবং এদের সেই মিটিমিটি আলো যেন নিভে না যায়, তা নিশ্চিত করতে আপনি কীভাবে সহায়তা করতে পারেন—সে বিষয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
এএফপি (AFP)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে জোনাকির সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে।
জার্সেস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক স্কট হফম্যান ব্ল্যাক বলেন, “আমাদের অনেকের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে বাড়ির আঙিনা, তৃণভূমি, জলাশয়ের কিনারা কিংবা পার্কে জোনাকির ঝলমলে আলো জড়িয়ে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক এলাকায় এখন আগের তুলনায় অনেক কম জোনাকি দেখা যায়।” তিনি বলেন, “আবাসস্থল ধ্বংস, আলোক দূষণ, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব জোনাকির সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।”
বিজ্ঞানীদের ধারণা, জোনাকিরা মূলত শিকারি প্রাণীদের সতর্ক করার জন্যই আলোর এই বৈশিষ্ট্যটি বিবর্তনের মাধ্যমে অর্জন করেছিল, তবে বর্তমানে তারা মূলত সঙ্গী খোঁজার কাজেই আলোর ঝলকানি ব্যবহার করে। এদের পেটের নিচের অংশে থাকা বিশেষ এক ধরনের অঙ্গ থেকে এই আলো উৎপন্ন হয়, যা অক্সিজেন গ্রহণ করে। অক্সিজেন যখন লুসিফেরিন (luciferin) ও লুসিফারেজ (luciferase) নামক দুটি রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে, তখন প্রায় কোনো তাপ ছাড়াই আলো তৈরি হয়; এ কারণেই জোনাকি প্রকৃতির অন্যতম দক্ষ আলোর উৎস হিসেবে বিবেচিত। প্রতিটি প্রজাতির আলোর ঝলকানির নিজস্ব ধরন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুরুষ জোনাকিরা স্ত্রী জোনাকি খোঁজার সময় প্রতি পাঁচ সেকেন্ড অন্তর আলো জ্বালায় ও নেভায় এবং স্ত্রী জোনাকিরা প্রতি দুই সেকেন্ড অন্তর নিজস্ব সংকেত বা আলোর ঝলকানি দিয়ে তার জবাব দেয়। এই আলোর আদান-প্রদানই তাদের মিলনের পথ তৈরি করে।
বাসস্থান ধ্বংস, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আলোক দূষণের মতো নানা কারণে জোনাকিরা বর্তমানে ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে রয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য জোনাকি আর্দ্র পরিবেশ, গাছপালা ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কৃত্রিম আলোর অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সঙ্গী আকর্ষণের জন্য তারা যে আলোর সংকেত বা ঝলকানি ব্যবহার করে, তা একে অপরের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাদের প্রজনন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে।
উত্তর আমেরিকার অর্ধেকেরও বেশি জোনাকি প্রজাতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় প্রকৃত ঝুঁকির মাত্রা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার’ (IUCN)-এর তালিকা অনুযায়ী, অন্তত ১৮টি জোনাকি প্রজাতিকে ইতোমধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জার্সেস সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক স্কট হফম্যান ব্ল্যাক বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আমরা জোনাকি এবং মৌমাছি ও প্রজাপতির মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পতঙ্গের সংখ্যা পুনরুদ্ধার করতে পারি। এর কারণগুলো আমরা জানি, পাশাপাশি সমাধানের পথও জানা আছে। এখন প্রয়োজন শুধু এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীদের আবাসস্থল রক্ষা ও পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।”
তিনি বলেন, জোনাকিদের সহায়তা করতে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট উদ্যোগও দীর্ঘমেয়াদে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জোনাকি রক্ষায় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ হলো—
অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখুন: শুধু নিরাপত্তার প্রয়োজনে আলো ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে এমন আলো ব্যবহার করুন, যেখানে ‘মোশন ডিটেক্টর’ (নড়াচড়া শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে ওঠে) সংযুক্ত থাকে। এতে অপ্রয়োজনীয় আলোক দূষণ কমবে।
কীটনাশকের ব্যবহার কমান: অর্থনৈতিক বা মানবস্বাস্থ্যের জন্য একান্ত প্রয়োজন না হলে কীটনাশক ব্যবহার এড়িয়ে চলুন। অধিকাংশ বাগানের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন।
বাগানকে কিছুটা প্রাকৃতিক থাকতে দিন: জোনাকির লার্ভা বা শূককীট মাটির নিচে, ভেজা গাছের গুঁড়ির আশপাশে এবং ঝরা পাতার স্তূপের নিচে বেড়ে ওঠে। তাই বাগান অতিরিক্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না রেখে কিছুটা প্রাকৃতিক অবস্থায় রাখা এবং ঝরা পাতা না সরানো তাদের জন্য উপকারী।
জোনাকির টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন অন্ধকার, আর্দ্রতা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পর্যাপ্ত খাবার। যদিও সাধারণত গ্রীষ্মকালেই আমরা জোনাকির কথা বেশি মনে করি, তবে তাদের জীবনচক্রের বড় অংশ কাটে অদৃশ্য অবস্থায়।
‘জার্সেস সোসাইটি’-র তথ্য অনুযায়ী, বছরের যেকোনো সময় জোনাকির ডিম, লার্ভা বা পিউপা (গুটিপোকা দশা) অবস্থায় থাকতে পারে। তাই সারা বছর তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :