ডেট্রয়েট, ২৬ আগস্ট : শহরের প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা ভাড়ার বাড়িতে বসবাস করেন। তাদের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে ডেট্রয়েট কর্তৃপক্ষ একটি ‘উচ্চাভিলাষী’ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৮ হাজারের বেশি ভাড়ার বাড়ি বা ইউনিট পরিদর্শন করে সেগুলো বসবাসের জন্য নিরাপদ কি না, তা যাচাই করা হবে এবং মানদণ্ড পূরণকারী বাড়িগুলোকে সনদ দেওয়া হবে।
২৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র মেরি শেফিল্ড ও অন্যান্য কর্মকর্তারা এ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এ সময় শেফিল্ড ও আবাসন পরিদর্শন বিভাগের কর্মকর্তারা পাঁচ দফা পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো এক বা দুই পরিবারের বসবাসের উপযোগী ছোট আকারের ভাড়ার বাড়িগুলোতে নির্ধারিত আবাসন কোড ও নিরাপত্তা মানদণ্ড যথাযথভাবে মেনে চলা নিশ্চিত করা। শহরের মোট ভাড়ার বাড়ির একটি বড় অংশই এ ধরনের ছোট ইউনিট। আবাসন অধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেট্রয়েটের অনেক বাসিন্দা বর্তমানে অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন। এমন পরিস্থিতিতে নতুন এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ছোট আকারের ভাড়ার বাড়িগুলোর প্রসঙ্গে মেয়র শেফিল্ড বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহরের পক্ষ থেকে ভাড়ার বাড়ির যে অংশটিতে সবচেয়ে কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে, আমরা এখন সেটির ওপরই পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছি।”
পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শহরের আনুমানিক ৮১ হাজার ভাড়ার বাড়ির প্রায় ২৫ শতাংশ ‘সার্টিফিকেট অব কমপ্লায়েন্স’ বা নিয়ম-কানুন মেনে চলার সনদ পাবে। এই সনদ প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট বাড়িটি নির্ধারিত পরিদর্শন প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়েছে এবং নিরাপত্তা ও আবাসন-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ করছে।
বর্তমানে ডেট্রয়েটের মাত্র ১৪ শতাংশ ভাড়ার বাড়ির ক্ষেত্রে এ ধরনের সনদ রয়েছে। নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।
সিটি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘সার্টিফিকেট অব কমপ্লায়েন্স’ পেতে বাড়ির মালিকদের ২২৫ ডলার ফি দিতে হয় এবং এটি প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। নিয়ম মেনে চলার হার কম হওয়ার পেছনে বাড়ির মালিকদের মধ্যে এ সনদ সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব এবং সিটি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রচারণার ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ডেট্রয়েট সিটির বিল্ডিং, সেফটি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিপার্টমেন্ট (BSEED)-এর পরিচালক ডেভিড বেল। তাঁর নেতৃত্বাধীন বিভাগটি মূলত ভাড়ার জন্য ব্যবহৃত বাড়িগুলোর পরিদর্শন কার্যক্রম তদারকি করে।
শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রেস্টন পার্ক এলাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বেল বলেন, “ডেট্রয়েট শহরের প্রচলিত কর্মসংস্কৃতি বা মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।”
ঐতিহাসিকভাবে সনদপ্রাপ্ত ভাড়ার বাড়ির সংখ্যা কম থাকার বিষয়ে বেল বলেন, “আমার মনে হয় না এর পেছনে কর্মীস্বল্পতা কোনো কারণ ছিল। বরং ডেট্রয়েট শহরের প্রচলিত সংস্কৃতি পরিবর্তন করাটাই কঠিন। তবে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিবর্ধন অব্যাহত রাখব।”
নতুন পাঁচ দফা পরিকল্পনার আওতায় BSEED একটি ‘মাস্টার এনফোর্সমেন্ট লিস্ট’ বা প্রধান তদারকি তালিকা তৈরি করবে। ভাড়ার জন্য ব্যবহৃত বাড়িগুলো শনাক্ত করতে এ তালিকায় শহরের সম্পত্তি-সংক্রান্ত নথি এবং ২৬তম ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
পরিকল্পনার অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় আবাসন পরিদর্শক নিয়োগ, মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পথে থাকা সনদগুলোর ওপর উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা চালু, বাড়ির মালিকদের আরও বেশি সহায়তা দেওয়া এবং ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিক—উভয়ের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।
‘ডেট্রয়েট টেন্যান্টস ইউনিয়ন’ (DTU)-এর মতো সংগঠনগুলোর মতে, সনদপ্রাপ্ত ভাড়ার বাড়ির সংখ্যা কম থাকা ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তাহীনতারই একটি চিত্র। বিশেষ করে মাসিক ভাড়া বাড়তে থাকা এবং অনেক বাড়ির মালিকের জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে ভাড়াটিয়ারা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে সংগঠনটির দাবি।
ডেট্রয়েট শহরের যথাযথ সনদ বা অনুমোদন না থাকা বাড়ি থেকে ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগে একটি সংগঠন সম্প্রতি শহরের ৩৬তম ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে।
জুন মাসে সিটি কাউন্সিলের এক বৈঠকে DTU-এর সদস্য ক্যাথরিন ও’ডনেল বলেন, “এই সংগঠনে যোগ দেওয়ার পর গত দুই বছরেরও কম সময়ে আমি দেখেছি, ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বহু বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। প্রতিহিংসামূলক কারণে কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই বারবার বাসিন্দাদের তাঁদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।”
ইউ.এস. সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ডেট্রয়েটের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছেন। ২০২০-এর দশকে শহরটিতে বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের দখলে থাকা আবাসিক ইউনিটের অনুপাতেও একাধিকবার পরিবর্তন দেখা গেছে।
পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জরাজীর্ণ ও অবহেলিত ভাড়ার বাড়ির সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ডেট্রয়েট কর্তৃপক্ষ। ২০২২ সালে শহর কর্তৃপক্ষ ‘রাইট টু কাউন্সেল’ নামে একটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। এর আওতায় যোগ্য বাসিন্দারা উচ্ছেদ-সংক্রান্ত মামলায় আইনি প্রতিনিধিত্ব পাওয়ার সুযোগ পান। এ ছাড়া, ভাড়াটিয়াদের প্রভাবিত করে এমন নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তার জন্য ২০২৪ সালে গঠন করা হয় ‘টেন্যান্টস রাইটস কমিশন’ বা ভাড়াটিয়া অধিকার কমিশন।
একসময় শহরের ভাড়ার বাড়ির মাত্র ১০ শতাংশ নির্ধারিত নগরীয় নিয়মকানুন বা কোড মেনে চলত। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ফিও কমিয়ে আনে। এর ফলে নিয়ম মেনে চলার হার বেড়ে বর্তমানে ১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের ‘পভার্টি সল্যুশনস’-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মিশিগানের অন্যান্য বাসিন্দাদের তুলনায় ডেট্রয়েটের বাসিন্দারা—বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠরা—বাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে বেশি রয়েছেন। গবেষণা দলের তথ্যমতে, ডেট্রয়েটে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের হার পুরো অঙ্গরাজ্যের গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মিশিগানের সামগ্রিক বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠীর তুলনায় ডেট্রয়েটের বয়োজ্যেষ্ঠরা—বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া উভয়েইআবাসন ব্যয়ের কারণে বেশি আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। রাজ্যের ৩১ শতাংশ বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকের তুলনায় ডেট্রয়েটের ৪৫ শতাংশ বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক তাঁদের আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি আবাসন ব্যয়ে ব্যয় করেন।
শহর কর্তৃপক্ষ বাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও জোরদার করেছে। গত মাসে একজন ডেভেলপারের সঙ্গে আইনি সমঝোতা অনুমোদন করে সিটি কর্তৃপক্ষ। ওই ডেভেলপারের মালিকানাধীন ২৯৯টি ভাড়ার বাড়ির বিরুদ্ধে জরাজীর্ণ ও অবহেলিত অবস্থার কারণে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার ডলারের বকেয়া জরিমানা বা ‘ব্লাইট টিকিট’ জমা হয়েছিল।
শহরের নথিপত্র অনুযায়ী, এসব বাড়ির মধ্যে প্রায় ২৪০টি দীর্ঘদিন ধরে সম্পত্তি কর বকেয়া থাকায় ট্যাক্স ফোরক্লোজারের ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া, মাত্র ৫৫টি বাড়ির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনে চলার সনদ বা ‘সার্টিফিকেট অব কমপ্লায়েন্স’ রয়েছে।
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :