একাত্তরের প্রবাসী বাঙালি : অর্থ,  শ্রম ও কণ্ঠে স্বাধীনতার সংগ্রাম

আপলোড সময় : ০২-১০-২০২৬ ০২:১৬:২৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-১০-২০২৬ ০২:১৬:২৮ পূর্বাহ্ন
লন্ডন, ২ অক্টোবর : সময়টা ১৯৭১ সাল। প্রতিদিনের মতো প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিরা নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ খবর এলো—পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দেশে শুরু হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ।
মাতৃভূমি ও স্বজনদের জন্য প্রবাসী বাঙালিদের হৃদয় কেঁদে উঠল। দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, স্বাধীনতার সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে হবে—এই তাগিদে প্রবাসী বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠেন। অনেকে সরাসরি দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, আবার অনেকে প্রবাসে থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন, অর্থ সংগ্রহ, প্রচার-প্রচারণা ও কূটনৈতিক তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাঙালিরা বিশ্বজনমত গঠন এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে তারা সভা, সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। পাশাপাশি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জনসমর্থন আদায় এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও তারা সক্রিয় ছিলেন।

আন্তর্জাতিক জনমত গঠন:
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরা ‘অ্যাকশন কমিটি’সহ বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলেন। স্থানীয় রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কাছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিক্ষোভ ও সমাবেশের মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তহবিল সংগ্রহ:
প্রবাসী বাঙালিরা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থীদের সহায়তায় দান করেন। বিভিন্ন সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও জনসংযোগ কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত অর্থ বাংলাদেশ তহবিলে প্রদান এবং মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সহায়তায় পাঠানো হয়।

কূটনৈতিক তৎপরতা:
বিদেশে কর্মরত কয়েকজন বাঙালি কূটনীতিক পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তাদের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে আরও জোরালো করে।

প্রচার ও লবিং:
প্রবাসীরা বিদেশি সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের গণহত্যা, নির্যাতন ও শরণার্থী সংকটের খবর প্রকাশে তারা সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি লিফলেট, পুস্তিকা ও অন্যান্য প্রচারসামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালান।

শরণার্থীদের সহায়তা:
ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ মানুষের সহায়তায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা অর্থ, খাদ্য ও ত্রাণ সংগ্রহ করে পাঠান। তাদের এই মানবিক সহায়তা শরণার্থীদের দুর্দশা লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন শহরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধের তহবিল সংগ্রহ করা হয়। ৪ জুন লন্ডনে প্রবাসী নারী ও শিশুরা পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে মিছিল করেন। যুক্তরাজ্যে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রবাসী শ্রমজীবী মানুষ—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বাঙালিই এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে প্রবাসী বাঙালিদের এই আত্মত্যাগ, অর্থসহায়তা, প্রচার, জনমত গঠন ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটির পক্ষ থেকে মহান স্বাধীনতার মাসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী, তহবিল সংগ্রহকারী, জনমত গঠনকারী এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত সেই সময়ের সকল প্রবাসী বাঙালির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

সম্পাদকীয় :

চিনু মৃধা : সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

সম্পাদক ও প্রকাশক : চিন্ময় আচার্য্য, নির্বাহী সম্পাদক : কামাল মোস্তফা, সহযোগী সম্পাদক : আশিক রহমান,

বার্তা সম্পাদক : তোফায়েল রেজা সোহেল, ফিচার এডিটর : সৈয়দ আসাদুজ্জামান সোহান, স্টাফ রিপোর্টার : মৃদুল কান্তি সরকার।

যোগাযোগ :

Phone : +1 (313) 312-7006

Email : suprobhatmichigan@gmail.com

Website : www.suprobhatmichigan.com