পশ্চিম মিশিগানের প্যালিসেডস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২০২২ সালের ছবি/Photo : Chris DuMond, Special To The Detroit News
কোভার্ট টাউনশিপ, ২১ অক্টোবর : ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথিতে পশ্চিম মিশিগানের প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্রে সাম্প্রতিক একাধিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালু হলে এটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো পারমাণবিক কেন্দ্র পুনরায় চালুর প্রথম ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর তদারককারী সংস্থা নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশনের (এনআরসি) আগস্টের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রটির কর্মীরা বাতাসে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসেন। এ ছাড়া, আগস্টে জ্বালানি দণ্ড পুনরায় স্থাপনের সময় সেটি ভুলভাবে ৩০ ডিগ্রি কোণে বেঁকে যায়। এনআরসিতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি সংরক্ষণের পুলে দণ্ডটি সরিয়ে নিতে কেন্দ্রটির মালিক প্রতিষ্ঠান হোলটেক ক্রেন ও স্লিং ব্যবহার করে একটি অপ্রচলিত পদ্ধতি প্রয়োগ করছে।
সম্প্রতি এনআরসি জানিয়েছে, কেন্দ্রটির সরবরাহব্যবস্থা ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ বিভাগের কর্মীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যা বা অন্যান্য উদ্বেগের বিষয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কিংবা এনআরসির কাছে তুলে ধরতে তাঁরা দ্বিধা বোধ করছেন।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অলাভজনক বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্থা ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পদার্থবিজ্ঞানী ও পারমাণবিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এডউইন লাইম্যান। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত যেসব সমস্যা সামনে এসেছে, তা দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীনতার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে, নিরাপত্তার চেয়ে দ্রুত কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
লাইম্যানের ভাষায়, এসব ঘটনা সতর্কসংকেত হতে পারে। সমস্যাগুলোর মূল কারণ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। কেন্দ্রটি চালুর আগেই এত সমস্যা দেখা দেওয়ায় বর্তমান ব্যবস্থাপনা এটিকে নিরাপদে পরিচালনা করতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
তবে নথিপত্র অনুযায়ী, এনআরসির বিবেচনায় এসব ঘটনার বেশির ভাগই নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে না।
প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্রের মালিক প্রতিষ্ঠান হোলটেক ইন্টারন্যাশনালের সরকারি বিষয়াবলি ও যোগাযোগ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক ও’ব্রায়েন জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি নিরাপদে পুনরায় চালু করতে কোম্পানি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে দ্রুততার চেয়ে নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ডেট্রয়েট নিউজের প্রশ্নের জবাবে ইমেইলে ও’ব্রায়েন বলেন, “প্ল্যান্টটি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রটি যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কাজ করছি। এ কারণেই প্ল্যান্টটি পুনরায় চালুর প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা পিছিয়ে গেছে।”
তিনি জানান, গত আগস্টে জ্বালানি রড পুনঃস্থাপনের সময় একটি রড হেলে পড়ার ঘটনায় প্যালিসেডস কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমানে কর্মীরা সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর প্রস্তুতিমূলক অন্যান্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ও’ব্রায়েন আরও বলেন, “প্যালিসেডসকে পুনরায় সচল করার জন্য বাকি কাজগুলো নিরাপদে সম্পন্ন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা বরাবরই বলে আসছি, প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষ হওয়ার পাশাপাশি ফেডারেল বিধিবিধান ও শিল্পের মানদণ্ড পূরণ হলেই কেবল প্যালিসেডস পুনরায় চালু করা হবে।”
প্যালিসেডস-এর কর্মীরা
উদ্বেগ প্রকাশ করতে ভীত
এনআরসি (NRC) গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল, কেন্দ্রটিতে ‘নিরাপত্তা-সচেতন কর্মপরিবেশ’ বজায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করা।
নথিপত্র ও রেকর্ড পর্যালোচনা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং কর্মীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর পরিদর্শকরা জানান, সেখানে বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা সমস্যা বা বিধিবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ কর্মী প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ জানাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও সরবরাহ শৃঙ্খল ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ বিভাগের কর্মীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।
১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এনআরসি জানায়, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীরা এমন কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন, যেখানে তাঁরা উদ্বেগ জানাতে পারেননি অথবা উত্থাপিত সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান পাননি। এসবের মধ্যে রয়েছে সরঞ্জাম সংগ্রহ ও সেগুলোর উপযুক্ততা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং কাজের নিয়ন্ত্রণ ও সম্পাদনসংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “গুণগত মান নিশ্চিতকরণ বিভাগটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।”
এনআরসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে কর্মপরিবেশের আরও অবনতি ঠেকাতে হোলটেককে পরিদর্শকদের উত্থাপিত উদ্বেগগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে।
প্যালিসেডস কেন্দ্রের কিছু কর্মীর অস্বস্তি নিয়ে এনআরসির উদ্বেগের বিষয়ে হোলটেকের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক ও’ব্রায়েন জানান, কোম্পানি এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “নিরাপত্তার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন কর্মপরিবেশ আমাদের প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পারমাণবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিজের মতামত তুলে ধরা এবং কোনো উদ্বেগ থাকলে তা জানানো অত্যন্ত জরুরি। এই পরিবেশ বজায় রাখা এবং উত্থাপিত উদ্বেগগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও সমাধান করা প্রতিটি স্তরের নেতৃত্বের দায়িত্ব।”
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এডউইন লাইম্যানের মতে, পারমাণবিক শিল্পে এ ধরনের সতর্কবার্তা সচরাচর দেখা যায় না।
তিনি বলেন, “বিষয়টি কিছুটা সন্দেহজনক, কারণ সাধারণত এ ধরনের প্রবণতা ওপরের পর্যায় থেকেই শুরু হয়। শীর্ষ ব্যবস্থাপনার কর্মসংস্কৃতি নিম্নস্তরের ব্যবস্থাপকদের কাজের ধরন সম্পর্কে সংকেত দেয়। এমনও হতে পারে, এর পেছনে কেবল গুটিকয়েক সমস্যা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি রয়েছেন। তবে আমার ধারণা, সমস্যাটি সম্ভবত আরও গভীর।”
প্যালিসেডস পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে
জ্বালানি দণ্ড হেলে পড়ায় উদ্বেগ
হোলটেক (Holtec) গত আগস্টে জানায়, তারা প্যালিসেডস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে নতুন ও আংশিক ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের কাজ করছে।
৩০ সেপ্টেম্বর এনআরসিকে (NRC) দেওয়া এক প্রতিবেদনে হোলটেক জানায়, চুল্লিতে জ্বালানি অ্যাসেম্বলি স্থাপনের সময় একটি অ্যাসেম্বলি রিফুয়েলিং মেশিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হেলে পড়ে।
হোলটেকের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাসেম্বলিটি প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণে হেলে রয়েছে। এর নিচের অংশ বা ‘লোয়ার টাই প্লেট’ চুল্লির কোরের এইচ-১ (H-1) অবস্থানে রয়েছে। আর ওপরের অংশ বা ‘আপার টাই প্লেট’ কোরের বিপরীত পাশে থাকা সুরক্ষা আবরণ বা ‘কোর শ্রাউড’-এর গায়ে ঠেস দিয়ে আছে।
এনআরসি হোলটেকের সেই পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যার আওতায় ক্রেন ও স্লিং ব্যবহার করে হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলিটি সরিয়ে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি সংরক্ষণের আধার ‘স্পেন্ট ফুয়েল পুলে’ স্থানান্তর করা হবে।
হোলটেকের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক ও’ব্রায়েন জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা করেছে। তাঁর দাবি, কাঠামোগত অখণ্ডতা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, তাপীয় অবস্থা ও বিকিরণ সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রকৌশলগত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এডউইন লাইম্যানের মতে, পানির বাইরে থাকা অবস্থায় জ্বালানি অ্যাসেম্বলি সরানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, এ অবস্থায় দুর্ঘটনা ঘটলে পানির নিচে থাকা জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি বিকিরণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে, পারমাণবিক শক্তির বিরোধিতাকারী সংগঠন ‘ডোন্ট ওয়েস্ট মিশিগান’-এর সঙ্গে যুক্ত পারমাণবিক প্রকৌশলী আর্নি গুন্ডারসন হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলি সরানোর অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য হোলটেকের অনুরোধ এবং এনআরসির অনুমোদনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গুন্ডারসন বলেন, “স্পষ্টতই জ্বালানি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্যই তারা হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলিটি সরানোর অনুমোদন চাইছে। অথচ, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে তারা কোনো ‘মূল কারণ বিশ্লেষণ’ (রুট কজ অ্যানালাইসিস) জমা দেয়নি। এমনকি, এই জ্বালানি অ্যাসেম্বলির কারণে চুল্লির ভেতরে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা-ও মূল্যায়ন করা হয়নি। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এ বিষয়ে জনমতামত গ্রহণ বা শুনানির কোনো সুযোগ দিতে তারা আগ্রহী নয়।”
অন্যদিকে, ও’ব্রায়েনের দাবি, হোলটেক পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পনা ও পর্যালোচনা করেছে এবং এনআরসির কাছে প্রমাণ করেছে যে, হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলিটি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, “এটি একটি সুচিন্তিত প্রক্রিয়া, কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করে করা হয়নি।”
বিকিরণের সংস্পর্শে
আসেন কর্মীরা
গত মার্চে প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শন করে এনআরসি (NRC)। পরিদর্শকরা দেখতে পান, উচ্চমাত্রার আলফা দূষণযুক্ত কাজের ক্ষেত্রে কেন্দ্রটি তার বিকিরণ সুরক্ষা কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ ছাড়া, বাতাসে তেজস্ক্রিয়তা রয়েছে—এমন এলাকায় কর্মরত ব্যক্তিদের শরীরে কী পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করেছে, অর্থাৎ তাঁদের অভ্যন্তরীণ বিকিরণমাত্রা (ইন্টারনাল ডোজ), তা নিরূপণেও ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রটি।
পরিদর্শকরা কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘনের দুটি অভিযোগ আনেন। তাঁদের বিবেচনায়, প্রতিটি লঙ্ঘনই নিরাপত্তার দিক থেকে ‘অত্যন্ত কম গুরুত্বপূর্ণ’। পাশাপাশি আরও কয়েকটি ছোটখাটো বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ও চিহ্নিত করা হয়।
পরিদর্শনে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রের ‘টিল্ট পিট’ এলাকায় বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল অনেক বেশি। সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষাসামগ্রী বা রেসপিরেটর ব্যবহার করছিলেন। তবে ওপরের তলায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও তা কাজ বন্ধ করার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছিল। তা সত্ত্বেও সেখানে কর্মীরা রেসপিরেটর ব্যবহার করেননি; তাঁদের শরীরে শুধু বাতাসের নমুনা সংগ্রহের যন্ত্র (এয়ার স্যাম্পলার) লাগানো ছিল। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সেখানে কোনো এয়ার মনিটরও ছিল না।
পরিদর্শকদের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে চালানো জরিপ ফেব্রুয়ারিতে সম্পাদিত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
এ ছাড়া, জানুয়ারিতে ‘শাটডাউন হিট এক্সচেঞ্জার’-এর কাছাকাছি এলাকায় বাতাসে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়। পরিদর্শকদের মতে, কেন্দ্রের কর্মীরা ওই পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারেননি।
প্রতিবেদনে পরিদর্শকরা লেখেন, “লাইসেন্সধারী কর্তৃপক্ষ উচ্চমাত্রার আলফা দূষণযুক্ত কাজের ক্ষেত্রে তাদের বিকিরণ সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি সহজেই আগে থেকে অনুমান করা, সংশোধন করা এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।”
পরিদর্শকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন এলাকায় কর্মরত ব্যক্তিদের শরীরে কী পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করেছে, তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতেও প্যালিসেডসের ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হয়েছে।
তবে হোলটেক প্যালিসেডসের সরকারি বিষয়াবলি ও যোগাযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক নিক কাল্প জানিয়েছেন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করতে কোম্পানি একটি মূল্যায়ন করেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
কাল্প বলেন, “এসব কাজের সময় কিছু কর্মী প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মাত্রার বিকিরণের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তবে কোনো কর্মীই ফেডারেল সরকারের নির্ধারিত পেশাগত বিকিরণসীমার কাছাকাছিও পৌঁছাননি। আমরা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর থেকে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি।”
প্যালিসেডসকে একটি
দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে
তুলতে চায় হোলটেক
পূর্ববর্তী মালিক এন্টারজি নিউক্লিয়ারের (Entergy Nuclear) কাছ থেকে কেন্দ্রটি কেনার প্রায় এক বছর পর, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্যালিসেডস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করে হোলটেক (Holtec)। এন্টারজি ২০১৭ সালেই জানিয়েছিল, ২০২২ সালে কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই, ২০২২ সালের মে মাসে কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
হোলটেক প্যালিসেডস পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়ার পর আরও দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর উদ্যোগের ঘোষণা আসে। এর মধ্যে রয়েছে পেনসিলভানিয়ার ‘থ্রি মাইল আইল্যান্ড’ (Three Mile Island) এবং আইওয়ার ‘ডুয়েন আর্নল্ড এনার্জি সেন্টার’ (Duane Arnold Energy Center)। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি পারমাণবিক কেন্দ্র পুনরায় চালুর ঘোষণা আসতে পারে।
প্যালিসেডস পুনরায় চালুর উদ্যোগে সহায়তার জন্য ২০২৪ সালে হোলটেককে ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ। এ ছাড়া, ডিসেম্বরে প্যালিসেডস এলাকায় দুটি ছোট পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য হোলটেককে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যয়-অংশীদারিত্বমূলক তহবিলও দেওয়া হয়।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ এডউইন লাইম্যানের মতে, প্যালিসেডস পুনরায় চালুর পেছনে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফেডারেল সরকারের উচিত কেন্দ্রটিতে এনআরসি (NRC) চিহ্নিত সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখা।
লাইম্যান বলেন, “হোলটেকের উচিত স্পষ্ট সমস্যাগুলো এড়াতে আরও সতর্ক হওয়া। তাদের এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার মনে হয়, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কিছু বিষয় হয়তো এনআরসির এখতিয়ারের বাইরে থাকতে পারে। তবে জ্বালানি বিভাগ যেহেতু এ প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন করছে, তাই জনগণের প্রত্যাশা করার অধিকার রয়েছে যে তাদের করের টাকা এমন কোনো কাজে ব্যয় হবে না, যা বিপজ্জনক হতে পারে।”
প্যালিসেডস পুনরায় চালু হলে সেখানে প্রায় ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রটি ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারসহ এ উদ্যোগের সমর্থকদের মতে, কেন্দ্রটি কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
এদিকে, প্যালিসেডস পুনরায় চালুর পরিকল্পনা শুরুর পর থেকে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা মিশিগানে বৃহৎ পরিসরের ‘হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থা পরিচালনা ও গবেষণার জন্য এসব কেন্দ্রে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
স্যালিন টাউনশিপে নির্মাণাধীন একটি ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজন হবে ১ দশমিক ৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ। এই চাহিদা প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ।
Source & Photo: http://detroitnews.com
কোভার্ট টাউনশিপ, ২১ অক্টোবর : ফেডারেল নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথিতে পশ্চিম মিশিগানের প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্রে সাম্প্রতিক একাধিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চালু হলে এটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো পারমাণবিক কেন্দ্র পুনরায় চালুর প্রথম ঘটনা।
যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর তদারককারী সংস্থা নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশনের (এনআরসি) আগস্টের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রটির কর্মীরা বাতাসে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসেন। এ ছাড়া, আগস্টে জ্বালানি দণ্ড পুনরায় স্থাপনের সময় সেটি ভুলভাবে ৩০ ডিগ্রি কোণে বেঁকে যায়। এনআরসিতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি সংরক্ষণের পুলে দণ্ডটি সরিয়ে নিতে কেন্দ্রটির মালিক প্রতিষ্ঠান হোলটেক ক্রেন ও স্লিং ব্যবহার করে একটি অপ্রচলিত পদ্ধতি প্রয়োগ করছে।
সম্প্রতি এনআরসি জানিয়েছে, কেন্দ্রটির সরবরাহব্যবস্থা ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ বিভাগের কর্মীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে জানিয়েছেন, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যা বা অন্যান্য উদ্বেগের বিষয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কিংবা এনআরসির কাছে তুলে ধরতে তাঁরা দ্বিধা বোধ করছেন।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অলাভজনক বিজ্ঞানভিত্তিক সংস্থা ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পদার্থবিজ্ঞানী ও পারমাণবিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এডউইন লাইম্যান। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত যেসব সমস্যা সামনে এসেছে, তা দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীনতার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে, নিরাপত্তার চেয়ে দ্রুত কেন্দ্রটি পুনরায় চালু করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
লাইম্যানের ভাষায়, এসব ঘটনা সতর্কসংকেত হতে পারে। সমস্যাগুলোর মূল কারণ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকবে। কেন্দ্রটি চালুর আগেই এত সমস্যা দেখা দেওয়ায় বর্তমান ব্যবস্থাপনা এটিকে নিরাপদে পরিচালনা করতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
তবে নথিপত্র অনুযায়ী, এনআরসির বিবেচনায় এসব ঘটনার বেশির ভাগই নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে না।
প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্রের মালিক প্রতিষ্ঠান হোলটেক ইন্টারন্যাশনালের সরকারি বিষয়াবলি ও যোগাযোগ বিভাগের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক ও’ব্রায়েন জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি নিরাপদে পুনরায় চালু করতে কোম্পানি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে দ্রুততার চেয়ে নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ডেট্রয়েট নিউজের প্রশ্নের জবাবে ইমেইলে ও’ব্রায়েন বলেন, “প্ল্যান্টটি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে নিরাপত্তাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে কেন্দ্রটি যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত কাজ করছি। এ কারণেই প্ল্যান্টটি পুনরায় চালুর প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা পিছিয়ে গেছে।”
তিনি জানান, গত আগস্টে জ্বালানি রড পুনঃস্থাপনের সময় একটি রড হেলে পড়ার ঘটনায় প্যালিসেডস কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমানে কর্মীরা সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর প্রস্তুতিমূলক অন্যান্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
ও’ব্রায়েন আরও বলেন, “প্যালিসেডসকে পুনরায় সচল করার জন্য বাকি কাজগুলো নিরাপদে সম্পন্ন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা বরাবরই বলে আসছি, প্রয়োজনীয় সব কাজ শেষ হওয়ার পাশাপাশি ফেডারেল বিধিবিধান ও শিল্পের মানদণ্ড পূরণ হলেই কেবল প্যালিসেডস পুনরায় চালু করা হবে।”
প্যালিসেডস-এর কর্মীরা
উদ্বেগ প্রকাশ করতে ভীত
এনআরসি (NRC) গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শন করে। পরিদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল, কেন্দ্রটিতে ‘নিরাপত্তা-সচেতন কর্মপরিবেশ’ বজায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করা।
নথিপত্র ও রেকর্ড পর্যালোচনা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং কর্মীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর পরিদর্শকরা জানান, সেখানে বড় ধরনের কোনো নিরাপত্তা সমস্যা বা বিধিবিধান লঙ্ঘনের ঘটনা পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ কর্মী প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ জানাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও সরবরাহ শৃঙ্খল ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ বিভাগের কর্মীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে।
১৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এনআরসি জানায়, সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মীরা এমন কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছেন, যেখানে তাঁরা উদ্বেগ জানাতে পারেননি অথবা উত্থাপিত সমস্যাগুলোর যথাযথ সমাধান পাননি। এসবের মধ্যে রয়েছে সরঞ্জাম সংগ্রহ ও সেগুলোর উপযুক্ততা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং কাজের নিয়ন্ত্রণ ও সম্পাদনসংক্রান্ত কার্যপদ্ধতি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “গুণগত মান নিশ্চিতকরণ বিভাগটি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।”
এনআরসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে কর্মপরিবেশের আরও অবনতি ঠেকাতে হোলটেককে পরিদর্শকদের উত্থাপিত উদ্বেগগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে।
প্যালিসেডস কেন্দ্রের কিছু কর্মীর অস্বস্তি নিয়ে এনআরসির উদ্বেগের বিষয়ে হোলটেকের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক ও’ব্রায়েন জানান, কোম্পানি এসব সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “নিরাপত্তার বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন কর্মপরিবেশ আমাদের প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পারমাণবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিজের মতামত তুলে ধরা এবং কোনো উদ্বেগ থাকলে তা জানানো অত্যন্ত জরুরি। এই পরিবেশ বজায় রাখা এবং উত্থাপিত উদ্বেগগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও সমাধান করা প্রতিটি স্তরের নেতৃত্বের দায়িত্ব।”
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এডউইন লাইম্যানের মতে, পারমাণবিক শিল্পে এ ধরনের সতর্কবার্তা সচরাচর দেখা যায় না।
তিনি বলেন, “বিষয়টি কিছুটা সন্দেহজনক, কারণ সাধারণত এ ধরনের প্রবণতা ওপরের পর্যায় থেকেই শুরু হয়। শীর্ষ ব্যবস্থাপনার কর্মসংস্কৃতি নিম্নস্তরের ব্যবস্থাপকদের কাজের ধরন সম্পর্কে সংকেত দেয়। এমনও হতে পারে, এর পেছনে কেবল গুটিকয়েক সমস্যা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি রয়েছেন। তবে আমার ধারণা, সমস্যাটি সম্ভবত আরও গভীর।”
প্যালিসেডস পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে
জ্বালানি দণ্ড হেলে পড়ায় উদ্বেগ
হোলটেক (Holtec) গত আগস্টে জানায়, তারা প্যালিসেডস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে নতুন ও আংশিক ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি স্থাপনের কাজ করছে।
৩০ সেপ্টেম্বর এনআরসিকে (NRC) দেওয়া এক প্রতিবেদনে হোলটেক জানায়, চুল্লিতে জ্বালানি অ্যাসেম্বলি স্থাপনের সময় একটি অ্যাসেম্বলি রিফুয়েলিং মেশিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হেলে পড়ে।
হোলটেকের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাসেম্বলিটি প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণে হেলে রয়েছে। এর নিচের অংশ বা ‘লোয়ার টাই প্লেট’ চুল্লির কোরের এইচ-১ (H-1) অবস্থানে রয়েছে। আর ওপরের অংশ বা ‘আপার টাই প্লেট’ কোরের বিপরীত পাশে থাকা সুরক্ষা আবরণ বা ‘কোর শ্রাউড’-এর গায়ে ঠেস দিয়ে আছে।
এনআরসি হোলটেকের সেই পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যার আওতায় ক্রেন ও স্লিং ব্যবহার করে হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলিটি সরিয়ে ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি সংরক্ষণের আধার ‘স্পেন্ট ফুয়েল পুলে’ স্থানান্তর করা হবে।
হোলটেকের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক ও’ব্রায়েন জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পরিকল্পনাটি পর্যালোচনা করেছে। তাঁর দাবি, কাঠামোগত অখণ্ডতা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, তাপীয় অবস্থা ও বিকিরণ সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রকৌশলগত মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এডউইন লাইম্যানের মতে, পানির বাইরে থাকা অবস্থায় জ্বালানি অ্যাসেম্বলি সরানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, এ অবস্থায় দুর্ঘটনা ঘটলে পানির নিচে থাকা জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি বিকিরণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে, পারমাণবিক শক্তির বিরোধিতাকারী সংগঠন ‘ডোন্ট ওয়েস্ট মিশিগান’-এর সঙ্গে যুক্ত পারমাণবিক প্রকৌশলী আর্নি গুন্ডারসন হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলি সরানোর অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য হোলটেকের অনুরোধ এবং এনআরসির অনুমোদনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গুন্ডারসন বলেন, “স্পষ্টতই জ্বালানি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্যই তারা হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলিটি সরানোর অনুমোদন চাইছে। অথচ, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে তারা কোনো ‘মূল কারণ বিশ্লেষণ’ (রুট কজ অ্যানালাইসিস) জমা দেয়নি। এমনকি, এই জ্বালানি অ্যাসেম্বলির কারণে চুল্লির ভেতরে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা-ও মূল্যায়ন করা হয়নি। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে, এ বিষয়ে জনমতামত গ্রহণ বা শুনানির কোনো সুযোগ দিতে তারা আগ্রহী নয়।”
অন্যদিকে, ও’ব্রায়েনের দাবি, হোলটেক পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পনা ও পর্যালোচনা করেছে এবং এনআরসির কাছে প্রমাণ করেছে যে, হেলে পড়া জ্বালানি অ্যাসেম্বলিটি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, “এটি একটি সুচিন্তিত প্রক্রিয়া, কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করে করা হয়নি।”
বিকিরণের সংস্পর্শে
আসেন কর্মীরা
গত মার্চে প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শন করে এনআরসি (NRC)। পরিদর্শকরা দেখতে পান, উচ্চমাত্রার আলফা দূষণযুক্ত কাজের ক্ষেত্রে কেন্দ্রটি তার বিকিরণ সুরক্ষা কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এ ছাড়া, বাতাসে তেজস্ক্রিয়তা রয়েছে—এমন এলাকায় কর্মরত ব্যক্তিদের শরীরে কী পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করেছে, অর্থাৎ তাঁদের অভ্যন্তরীণ বিকিরণমাত্রা (ইন্টারনাল ডোজ), তা নিরূপণেও ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রটি।
পরিদর্শকরা কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে বিধি লঙ্ঘনের দুটি অভিযোগ আনেন। তাঁদের বিবেচনায়, প্রতিটি লঙ্ঘনই নিরাপত্তার দিক থেকে ‘অত্যন্ত কম গুরুত্বপূর্ণ’। পাশাপাশি আরও কয়েকটি ছোটখাটো বিধি লঙ্ঘনের বিষয়ও চিহ্নিত করা হয়।
পরিদর্শনে দেখা যায়, গত ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রের ‘টিল্ট পিট’ এলাকায় বাতাসে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল অনেক বেশি। সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা শ্বাসযন্ত্রের সুরক্ষাসামগ্রী বা রেসপিরেটর ব্যবহার করছিলেন। তবে ওপরের তলায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা তুলনামূলক কম হলেও তা কাজ বন্ধ করার নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছিল। তা সত্ত্বেও সেখানে কর্মীরা রেসপিরেটর ব্যবহার করেননি; তাঁদের শরীরে শুধু বাতাসের নমুনা সংগ্রহের যন্ত্র (এয়ার স্যাম্পলার) লাগানো ছিল। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সেখানে কোনো এয়ার মনিটরও ছিল না।
পরিদর্শকদের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরবর্তী সময়ে চালানো জরিপ ফেব্রুয়ারিতে সম্পাদিত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
এ ছাড়া, জানুয়ারিতে ‘শাটডাউন হিট এক্সচেঞ্জার’-এর কাছাকাছি এলাকায় বাতাসে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়। পরিদর্শকদের মতে, কেন্দ্রের কর্মীরা ওই পরিস্থিতি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারেননি।
প্রতিবেদনে পরিদর্শকরা লেখেন, “লাইসেন্সধারী কর্তৃপক্ষ উচ্চমাত্রার আলফা দূষণযুক্ত কাজের ক্ষেত্রে তাদের বিকিরণ সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি সহজেই আগে থেকে অনুমান করা, সংশোধন করা এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।”
পরিদর্শকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন এলাকায় কর্মরত ব্যক্তিদের শরীরে কী পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করেছে, তা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতেও প্যালিসেডসের ব্যবস্থাপনা ব্যর্থ হয়েছে।
তবে হোলটেক প্যালিসেডসের সরকারি বিষয়াবলি ও যোগাযোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক নিক কাল্প জানিয়েছেন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করতে কোম্পানি একটি মূল্যায়ন করেছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
কাল্প বলেন, “এসব কাজের সময় কিছু কর্মী প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মাত্রার বিকিরণের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তবে কোনো কর্মীই ফেডারেল সরকারের নির্ধারিত পেশাগত বিকিরণসীমার কাছাকাছিও পৌঁছাননি। আমরা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর থেকে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি।”
প্যালিসেডসকে একটি
দৃষ্টান্ত হিসেবে গড়ে
তুলতে চায় হোলটেক
পূর্ববর্তী মালিক এন্টারজি নিউক্লিয়ারের (Entergy Nuclear) কাছ থেকে কেন্দ্রটি কেনার প্রায় এক বছর পর, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্যালিসেডস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর পরিকল্পনা ঘোষণা করে হোলটেক (Holtec)। এন্টারজি ২০১৭ সালেই জানিয়েছিল, ২০২২ সালে কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক সপ্তাহ আগেই, ২০২২ সালের মে মাসে কেন্দ্রটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।
হোলটেক প্যালিসেডস পুনরায় চালুর পরিকল্পনা নেওয়ার পর আরও দুটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর উদ্যোগের ঘোষণা আসে। এর মধ্যে রয়েছে পেনসিলভানিয়ার ‘থ্রি মাইল আইল্যান্ড’ (Three Mile Island) এবং আইওয়ার ‘ডুয়েন আর্নল্ড এনার্জি সেন্টার’ (Duane Arnold Energy Center)। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি পারমাণবিক কেন্দ্র পুনরায় চালুর ঘোষণা আসতে পারে।
প্যালিসেডস পুনরায় চালুর উদ্যোগে সহায়তার জন্য ২০২৪ সালে হোলটেককে ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগ। এ ছাড়া, ডিসেম্বরে প্যালিসেডস এলাকায় দুটি ছোট পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য হোলটেককে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যয়-অংশীদারিত্বমূলক তহবিলও দেওয়া হয়।
ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ এডউইন লাইম্যানের মতে, প্যালিসেডস পুনরায় চালুর পেছনে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ফেডারেল সরকারের উচিত কেন্দ্রটিতে এনআরসি (NRC) চিহ্নিত সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখা।
লাইম্যান বলেন, “হোলটেকের উচিত স্পষ্ট সমস্যাগুলো এড়াতে আরও সতর্ক হওয়া। তাদের এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যা নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার মনে হয়, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কিছু বিষয় হয়তো এনআরসির এখতিয়ারের বাইরে থাকতে পারে। তবে জ্বালানি বিভাগ যেহেতু এ প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন করছে, তাই জনগণের প্রত্যাশা করার অধিকার রয়েছে যে তাদের করের টাকা এমন কোনো কাজে ব্যয় হবে না, যা বিপজ্জনক হতে পারে।”
প্যালিসেডস পুনরায় চালু হলে সেখানে প্রায় ৬০০ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রটি ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারসহ এ উদ্যোগের সমর্থকদের মতে, কেন্দ্রটি কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
এদিকে, প্যালিসেডস পুনরায় চালুর পরিকল্পনা শুরুর পর থেকে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা মিশিগানে বৃহৎ পরিসরের ‘হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থা পরিচালনা ও গবেষণার জন্য এসব কেন্দ্রে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
স্যালিন টাউনশিপে নির্মাণাধীন একটি ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজন হবে ১ দশমিক ৪ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ। এই চাহিদা প্যালিসেডস পারমাণবিক কেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ।
Source & Photo: http://detroitnews.com