বন্ধ ১৭১ কারখানার উৎপাদন

গ্যাস সংকটে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে হবিগঞ্জের শিল্প খাত

আপলোড সময় : ১৫-০৮-২০২৬ ০৩:২২:২৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৫-০৮-২০২৬ ০৩:২২:২৮ পূর্বাহ্ন
হবিগঞ্জ : তীব্র গ্যাস সংকটে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে হবিগঞ্জের শিল্প খাত। প্রায় ২০ দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকার পর গত বুধবার থেকে জেলার অনেক শিল্পকারখানায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এতে ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, সংকট শুরুর পর কখনো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, আবার কখনো এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। এত কম চাপেও স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে বুধবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত থমকে গেছে।
যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) আবুল হোসেন জানান, পার্কটিতে টায়ার, স্পিনিং, ফেব্রিক্স, পেপার, পলি সিল্ক ও পাওয়ারপ্ল্যান্টসহ ছয়টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে টায়ার ও পাওয়ারপ্ল্যান্ট ছাড়া অন্যগুলো শতভাগ রপ্তানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ কর্মরত। অনুমোদিত গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও কয়েক দিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার রাত ১২টার পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের শাহজীবাজার আঞ্চলিক বিতরণ কার্যালয়ের প্রধান মো. খালেদ গনি জানান, হবিগঞ্জে দৈনিক প্রায় ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্প খাতে সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ২১ জুলাই থেকে সমস্যাটি শুরু হয়েছে এবং গত কয়েক দিনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। তবে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলো। উদ্যোক্তাদের দাবি, উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে অর্ডার বাতিলের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাদশা পাইওনিয়রের মহাব্যবস্থাপক (অ্যাডমিন) মো. খায়রুল আলম জানান, তাদের কারখানায় স্পিনিং, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন ইউনিট রয়েছে। কয়েক দিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেলেও বুধবার থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৬ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজের বাইরে রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট করতে না পারলে কোটি কোটি টাকার রপ্তানি অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সায়হাম গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. রেজাউল হক জানান, ২২ জুলাই থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। কখনো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ, কখনো এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া গেছে। বর্তমানে পুরো উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৭ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা রয়েছেন। গ্যাসনির্ভর নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা থাকায় গ্যাস না থাকায় কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও সম্ভব হচ্ছে না।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক দীপক কুমার দেব জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার পর থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন থেমে গেছে।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, তাদের কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। শতভাগ রপ্তানিমুখী এই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সময়মতো শিপমেন্ট দিতে না পারলে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
হবিগঞ্জের সংকটের পেছনে জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সরবরাহ ঘাটতিও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের মার্চে দৈনিক স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। অথচ ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট।
স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসিক ও পরিবহন—সব খাতেই এর প্রভাব পড়ছে।
হবিগঞ্জের শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন বন্ধ থাকার ক্ষতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানি অর্ডার, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
তাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়—শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে।

সম্পাদকীয় :

চিনু মৃধা : সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি

সম্পাদক ও প্রকাশক : চিন্ময় আচার্য্য, নির্বাহী সম্পাদক : কামাল মোস্তফা, সহযোগী সম্পাদক : আশিক রহমান,

বার্তা সম্পাদক : তোফায়েল রেজা সোহেল, ফিচার এডিটর : সৈয়দ আসাদুজ্জামান সোহান, স্টাফ রিপোর্টার : মৃদুল কান্তি সরকার।

অফিস :

22021 Memphis Ave Warren, MI 48091

Phone : +1 (313) 312-7006

Email : [email protected]

Website : www.suprobhatmichigan.com