চিন্ময় আচার্যের ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। ঢাকার বাংলাবাজার ও সিলেটের জিন্দাবাজারে দপ্তর থাকা অভ্র প্রকাশন থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রথম প্রকাশিত এই গ্রন্থটি নিছক একজন ব্যক্তির আত্মকথা নয়; এটি প্রায় পাঁচ দশকের বাংলাদেশ—বিশেষত হবিগঞ্জ ও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের—সমাজ, রাজনীতি ও সাংবাদিকতার একটি জীবন্ত দলিল।
প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ, বইয়ের গায়ে মূল্য লেখা সাড়ে সাতশ টাকা, আর আন্তর্জাতিক মান বইপত্র নম্বর সংযুক্ত থাকার বিষয়টিও প্রমাণ করে প্রকাশনাটি নিছক পারিবারিক স্মারক নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ও সাহিত্যিক প্রকাশনা হিসেবেই সাজানো হয়েছে। বইটির উৎসর্গপত্রে লেখক তাঁর প্রয়াত বাবা চিত্ত রঞ্জন আচার্য ও মা শেফালী রানী আচার্যকে স্মরণ করেছেন, যা প্রথম পাতা থেকেই বইটির সুর নির্ধারণ করে দেয়—এটি হবে গভীরভাবে ব্যক্তিগত, অথচ একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতায় পরিপূর্ণ এক আখ্যান।
বাংলা মূল রচনার পাশাপাশি গ্রন্থটিতে সম্পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদও সংযুক্ত করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই চেয়েছেন এই স্মৃতিকথা কেবল বাংলাভাষী পাঠকের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে প্রবাসী বাঙালি প্রজন্ম ও আন্তর্জাতিক পাঠকসমাজের কাছেও পৌঁছাক। এই দ্বিভাষিক কাঠামোই বইটিকে একটি সাধারণ স্মৃতিকথার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী একটি প্রকল্পে পরিণত করেছে, কারণ লেখক নিজে দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে উপলব্ধি করেছেন যে দেশ ছেড়ে যাওয়া প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও নিজের শিকড়ের গল্প পৌঁছে দেওয়া কতটা জরুরি।
বইয়ের শুরুতে সাংবাদিক ও লেখক অপূর্ব শর্মার লেখা যে ভূমিকা সংযুক্ত হয়েছে, তা এই গ্রন্থের চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে অনেকখানি। তিনি লিখেছেন, মানুষের জীবন কেবল দিনপঞ্জির হিসাব নয়; জীবন আসলে স্মৃতির দীর্ঘ নদী, যা ব্যক্তিগত বেদনা, আনন্দ ও সংগ্রামের ঢেউ বহন করে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের উপকূলে এসে মেশে। যে মানুষ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন, অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে আসেন, সমাজের পরিবর্তনকে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থেকে সময়কে ধারণ করেন, তাঁর স্মৃতিচারণ কখনও নিছক আত্মকথা হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, একটি সময়ের দলিল, একটি জাতির চলমান ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য অনুষজ্ঞ।
চিন্ময় আচার্যের এই গ্রন্থ সেই নদীরই একটি দলিল, যেখানে ব্যক্তিগত জীবনকথা ক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে একটি সমাজের প্রতিচ্ছবিতে। ভূমিকাকার যথার্থই
লক্ষ করেছেন যে বইটির সবচেয়ে বড়ো শক্তি এর নির্মোহ সততা। লেখক কোথাও নিজেকে বীর বা নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেননি; বরং নিজের দ্বিধা, ব্যর্থতা, ভুল সিদ্ধান্ত, আত্মসমালোচনা ও অনুশোচনাকেও সমান সাহসের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই আত্মসমালোচনামূলক সততা বাংলা স্মৃতিকথার ধারায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন, কারণ প্রকৃত স্মৃতিকথা কখনও আত্মপ্রশস্তির গ্রন্থ হয়ে ওঠে না; তা হয়ে ওঠে আত্মসমীক্ষার আয়না। ভূমিকাকার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রেখেছেন—বইটির ভাষা সহজ, আন্তরিক ও কথোপকথনধর্মী, কোথাও অপ্রয়োজনীয় অলংকারের ভার নেই, আবার কোথাও শুষ্ক তথ্যের একঘেয়েমিও নেই, ফলে পাঠক সহজেই লেখকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন।
গ্রন্থের সূচিপত্রের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কোনো ধারাবাহিক কালানুক্রমিক আত্মজীবনী নয়; বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর নির্বাচিত স্মৃতিচারণ, যা সাঁইত্রিশটি স্বতন্ত্র রচনায় বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায় নিজের মধ্যেই একটি সম্পূর্ণ গল্প, যার নিজস্ব সূচনা, দ্বন্দ্ব ও পরিণতি রয়েছে। এই খণ্ড খণ্ড কাঠামো বইটিকে একদিক থেকে পড়তে সহজ করে তুলেছে—পাঠক যেকোনো অধ্যায় থেকে শুরু করতে পারেন—আবার অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে পড়লে বোঝা যায় কীভাবে এই টুকরো টুকরো স্মৃতি একত্রে একজন মানুষের সাংবাদিকতা-জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র নির্মাণ করে। লেখকের নিজের ভাষায়, এই গ্রন্থ তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের পথচলারই এক আন্তরিক প্রতিফলন—চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেখা মানুষ, প্রত্যক্ষ করা ঘটনা, সমাজের পরিবর্তন, অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের কিছু
নির্বাচিত অধ্যায় এখানে স্থান পেয়েছে। লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন যে সাংবাদিকতার পথ কখনোই সহজ ছিল না, নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেও তিনি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হননি, আর এই বই সেই দায়বদ্ধতারই ফসল।
লেখকের কথায় প্রকাশিত জীবনপঞ্জি অনুসারে, চিন্ময় আচার্যের জন্ম ১৯৬০ সালের ৩ মে হবিগঞ্জ জেলা শহরে। তিনি স্বর্গীয় চিত্ত রঞ্জন আচার্য ও স্বর্গীয় শেফালী রানী আচার্যের দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর পিতৃভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার খান্দুরা গ্রামে, আর মাতুলালয় একই উপজেলার ফান্দাউক গ্রামে অবস্থিত। স্কুলজীবনেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা হয় এবং বৃন্দাবন সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্য সংকলন ‘রানার’ শিক্ষাঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিল। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ, মানুষের জীবন ও সমাজের নানা বাস্তবতা তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার পেশায় নিয়ে আসে। ১৯৭৮ সালে ঢাকায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নয়াবার্তা’ পত্রিকায় হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
সেই সময়ে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা ডিজিটাল প্রযুক্তির কোনো সুবিধা ছিল না; সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই ও প্রতিবেদন পাঠানোর প্রতিটি ধাপই ছিল শ্রমসাধ্য। কিন্তু সংবাদ ও মানুষের জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরার গভীর দায়বোধ, পেশার প্রতি নিষ্ঠা এবং লেখনীর শক্তির প্রতি বিশ্বাস তাঁকে প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। এরপর ১৯৮০ সালে যশোর থেকে প্রকাশিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক ‘স্ফুলিঙ্গ’-এ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দৈনিক ‘স্বাধীনতা’, ‘নয়াবাংলা’, ‘জালালাবাদী’, সাপ্তাহিক ‘সিলেট সমাচার’, দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ ও দৈনিক ‘জনতা’সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৮২ সালে হবিগঞ্জ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘স্বাধিকার’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। এছাড়াও সাপ্তাহিক ‘দৃষ্টিকোণ’ ও ‘হবিগঞ্জ সমাচার’ পত্রিকার সম্পাদনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত থেকে সংবাদ সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি, আর ১৯৯৭ সালে হবিগঞ্জের প্রথম দৈনিক পত্রিকা ‘প্রতিদিনের বাণী’ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০২ সালে সেই পত্রিকা থেকে পদত্যাগের পর একই বছরের ২ আগস্ট তরুণ সংবাদকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন দৈনিক ‘হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’, যা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের নিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা ও প্রকাশনা জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ প্রবাস জীবনেও বহু বছর নিজের পেশা থেকে দূরে থাকলেও সংবাদ ও লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনোই কমেনি, আর সন্তানদের তাগিদে এবং নিজের ভেতরের সুপ্ত সাংবাদিকতাসত্তার অনুপ্রেরণায় তিনি আবার সংবাদচর্চার জগতে ফিরে আসেন। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে বসবাসকালেও সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর টান কমেনি; সেখান থেকে তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘সুপ্রভাত মিশিগান’-এর যাত্রা শুরু করেন, যা আজ আট বছর পূর্ণ করেছে। এই দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি বাঁক বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, ফলে গ্রন্থটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ও বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হয়ে উঠেছে।
বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘স্মৃতির ভেতর বাবার নিঃশব্দ আশীর্বাদ’ দিয়েই লেখক পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেন। বাবা নেই বহু বছর, তবু লেখকের মনে হয় তিনি প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে আছেন—নিঃশব্দ আশীর্বাদের মতো, দৃশ্যমান নন অথচ অদৃশ্য উপস্থিতিতে আজও তিনি লেখকের চলার পথের সঙ্গী। এই অধ্যায়ে ফুটে ওঠে এক
জটিল অথচ গভীর সম্পর্কের ছবি: বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সম্মানজনক ও নিরাপদ কোনো পেশায় নিজেকে গড়ে তুলুক, কিন্তু ছেলে বেছে নিলেন সাংবাদিকতা—বাবার স্বপ্নের ঠিক বিপরীত এক পথ। বাবা এই পেশাকে কখনোই ভালো চোখে দেখেননি এবং বারবার সতর্ক করতেন
যে সাংবাদিকতা বিপজ্জনক পেশা, সত্য লিখতে গিয়ে একদিন না একদিন বড়ো বিপদে পড়তে হতে পারে, এমনকি জীবনও চলে যেতে পারে। এই দ্বন্দ্ব শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সমাজেরই এক চিরন্তন বাস্তবতা, যেখানে সন্তানের আদর্শনিষ্ঠা আর অভিভাবকের নিরাপত্তা-উদ্বেগ মুখোমুখি দাঁড়ায়। লেখক
অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর আবেগে সেই সম্পর্ককে নির্মাণ করেছেন, যা বইয়ের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশগুলোর একটি এবং একই সঙ্গে একজন সন্তানের অপরিসীম কৃতজ্ঞতা ও আবেগ এবং একটি প্রজন্মের পারিবারিক মূল্যবোধেরও প্রতিফলন।
গ্রন্থের কেন্দ্রীয় সুর হলো সাংবাদিকতার নৈতিক দ্বন্দ্ব ও ঝুঁকি। ‘সত্যের পথে বন্ধুত্বের পরীক্ষা: হবিগঞ্জে শিশু খাদ্য কেলেঙ্কারি’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক বর্ণনা করেছেন কীভাবে নব্বইয়ের দশকে তাঁর ছেলেবেলার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যিনি জীবদ্দশায় প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক ছিলেন, শিশু খাদ্যের একটি চালান গোপনে কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। হবিগঞ্জের একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এই দুর্নীতির তথ্য লেখকের হাতে তুলে দেন, আর তথ্য যাচাইয়ের সময় সেই বন্ধু নিজে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা নানাভাবে অনুরোধ করেছিলেন যেন সংবাদটি প্রকাশ না করা হয়; এমনকি সীমাহীন অর্থের প্রলোভনও দেখানো হয়েছিল। লেখক লিখেছেন, দুর্নীতি, অনিয়ম বা অন্যায় যখন সমাজের বাতাসকে দূষিত করে তোলে, তখন নীরবতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড়ো সহায়তা, আর তিনি সেই নীরবতার অংশ হতে চাননি—মানুষ যত ঘনিষ্ঠই হোক, সম্পর্ক যত পুরোনোই হোক, সত্যের সামনে কোনো পক্ষপাত তিনি করেননি। এই অধ্যায়টি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে সাংবাদিকতা কেবল তথ্য সংগ্রহের পেশা নয়; এটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পেশাগত দায়বদ্ধতার মধ্যে প্রতিনিয়ত এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন।
একই সুরের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ‘বন্ধুত্ব বনাম দায়িত্ব: সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতা’ ও ‘বন্ধুত্ব, সাংবাদিকতা ও সিঁথি: একটি জীবনের অমূল্য অধ্যায়’ শীর্ষক রচনাগুলোতেও, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর পেশাগত সততার টানাপোড়েন বারবার ফিরে আসে। ‘গুড়ের আড়ালে ভেজাল’ শীর্ষক অধ্যায়টিও একই ধারার—খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোর মতো অতি সাধারণ অথচ জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর অপরাধ কীভাবে একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধানী দৃষ্টির সামনে উন্মোচিত হয়, তারই একটি দৃষ্টান্ত এখানে ফুটে উঠেছে। এই অধ্যায়গুলো একত্রে প্রমাণ করে যে লেখকের কাছে সততা কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে অর্জন করা এক কঠিন অনুশীলন।
সাংবাদিকতার পথে হুমকি ও ঝুঁকির বর্ণনাও বইটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। ‘জীবন্ত কবরের হুমকি’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক স্মরণ করেছেন আশির দশকের এক অভিজ্ঞতা, যখন সাপ্তাহিক ‘দৃষ্টিকোণ’-এ কর্মরত থাকাকালীন চুনারুঘাটের আলোচিত ‘চুন্নু হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে স্বনামে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তিনি, যা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলে তীব্র আলোড়ন তোলে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর একের পর এক হুমকি আসতে থাকে, এমনকি ‘জীবন্ত কবর দেওয়ার’ মতো নৃশংস হুমকিও তাঁকে শুনতে হয়। তবু কলম থামাননি তিনি, ভয়কে অতিক্রম করেই প্রতিবেদন লেখা অব্যাহত রাখেন। এই সাহসের পেছনে সবচেয়ে বড়ো প্রেরণা
ছিলেন তাঁদের সাহসী প্রবীণ সম্পাদক প্রয়াত নোমান চৌধুরী, যিনি কেবল একজন সম্পাদক ছিলেন না, ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল এক অভিভাবক, যাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল হুমকির কাছে মাথা নত না হয়ে তথ্যের কাছে দায়বদ্ধ থাকাই সাংবাদিকতার মূল শপথ। এই সংকটকালে স্থানীয় আরেকজন মানুষের মানবিক ভূমিকার
কথাও লেখক কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন—একজন আইনজীবী, যিনি নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর রাখতেন এবং সাহস জোগাতেন, আর লেখকের মামাও ছিলেন এক অটল আশ্রয়, যিনি স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, সত্যের পথে থাকলে কেউ একা থাকে না।
অনুরূপ নাটকীয় এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা মেলে ‘চিন্ময়, বাসা থেকে সরে যা, তোকে গ্রেফতার করতে আসছি’ শীর্ষক অধ্যায়ে, যেখানে এসএসসি পরীক্ষার ইতিহাস বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জেরে—যা একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে হবিগঞ্জে সংঘটিত হয় এবং দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়—লেখককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল, কারণ প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের পরিবারের একজন সদস্যের সংশ্লিষ্টতার গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। থানার তৎকালীন ওসি, যিনি ব্যক্তিগতভাবে লেখকের বন্ধু ছিলেন, অসহায় কণ্ঠে ফোন করে জানান যে এটি সরাসরি জেলা প্রশাসকের নির্দেশ এবং তাঁর কিছু করার নেই; লেখক মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাসা থেকে সরে যান, যদিও অল্প
সময়ের মধ্যেই ঘটনার মোড় বদলে যায় এবং প্রশাসনিক চাপে জেলা প্রশাসক সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এই ধরনের অধ্যায়গুলো স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার পথ কখনও মসৃণ ছিল না; সত্য প্রকাশের মূল্য অনেক সময় ভয়, হুমকি, সামাজিক চাপ এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দিয়েও
দিতে হয়েছে, আর একজন সংবাদকর্মীকে যেতে হয়েছে অদেখা এক ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে।
গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতা ও প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকতার সংঘাত। ‘প্রশাসনের রোষে সাংবাদিকতা ও ন্যায়ের জয়’, ‘রক্ষকই যখন ভক্ষক: এক স্মৃতিকথা’ এবং ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গল্প’—এই অধ্যায়গুলো একত্রে দেখায় কীভাবে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল বা এমনকি
আইনরক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর লেখক প্রতিবারই পেশাগত সততা বজায় রেখে সেসব বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন।
‘সাংবাদিকতার ঝুঁকি ও সামাজিক দায়: এক বাস্তব অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক অধ্যায়টিও এই ধারাবাহিকতারই অংশ, যেখানে সংবাদকর্মীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আর সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার মধ্যেকার টানাপোড়েন তুলে ধরা হয়েছে। এই আখ্যানগুলোর গুরুত্ব এখানেই যে, রাজধানীকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার বাইরে জেলা শহরের সংবাদকর্মীদের জীবনসংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা, দায়িত্ববোধ ও সাহসের যে ইতিহাস প্রায়ই অপ্রকাশিত থেকে যায়, লেখক তারই একটি মূল্যবান বিবরণ উপস্থাপন করেছেন নির্মোহভাবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাস রচনায় এই ধরনের স্মৃতিকথা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে গ্রন্থের গুরুত্ব শুধু সাংবাদিকতার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত মানুষের বই। এখানে মানুষের হাসি আছে, কান্না আছে; বন্ধুত্ব আছে, বিশ্বাসঘাতকতা আছে; আদর্শ আছে, আপস আছে; মৃত্যু আছে, বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা আছে।
‘জগদীশ মোদক: হবিগঞ্জের মানবিক এক আলোকবর্তিকা’, ‘হবিগঞ্জের ডা. মো. জমির আলী: হৃদয় ছোঁয়া এক চিকিৎসকের গল্প’, ‘অবিচল সাহসী যোদ্ধা: স্বপ্না চক্রবর্তীর সংগ্রামের গল্প’, ‘ন্যায় ও সাহসিকতার প্রতীক: আমীর হোসেন’, ‘স্মৃতির আলোয় সৈয়দ মোঃ ফয়সল’ এবং ‘বন্ধুবর মিলন রশীদ: সাংবাদিকতার পথে এক সহযাত্রী’—এই অধ্যায়গুলোতে লেখক তাঁর চারপাশে থাকা সাধারণ ও অসাধারণ মানুষদের প্রতিকৃতি এঁকেছেন গভীর মমতায়।
একজন পুলিশ সুপারের স্মৃতিচারণ থেকে শুরু করে সমাজসেবী, চিকিৎসক ও সংগ্রামী নারীর জীবনকথা পর্যন্ত—প্রতিটি চরিত্র বাস্তব, প্রতিটি ঘটনা জীবনঘনিষ্ঠ।
লেখক মানুষকে যেভাবে দেখেছেন, তাতে বিচার করার চেয়ে বোঝার প্রচেষ্টাই বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। ‘২০ টাকার কুপন থেকে ২০ হাজার টাকার মানবিক দান’ শীর্ষক অধ্যায়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এখানে একটি অতি সামান্য ঘটনার মধ্য দিয়ে মানবিকতার বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরা হয়েছে—কীভাবে সামান্য একটি
উদ্যোগ ক্রমে বড়ো মানবিক সহায়তায় রূপান্তরিত হতে পারে, তারই একটি দৃষ্টান্ত এই রচনা। একইভাবে ‘একটি বিবেকী স্বীকারোক্তি’ ও ‘শান্তির পথে সমাধান’ শীর্ষক অধ্যায় দুটিতে বিবেকের দংশন, অনুশোচনা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রয়াস প্রতিফলিত হয়েছে, যা লেখকের সাংবাদিকতাকে নিছক তথ্য প্রকাশের কাজ না রেখে মানবিক মধ্যস্থতার একটি ভূমিকাতেও উন্নীত করে। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রন্থটিকে কেবল সাংবাদিকতার দলিল না রেখে একটি হৃদয়গ্রাহী সমাজচিত্রে রূপান্তরিত করেছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকেও বইটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘শেখ হাসিনা ও সংবাদ প্রতিবেদনের নীরব দ্বন্দ্ব’ শীর্ষক অধ্যায়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার হবিগঞ্জ সফরের বর্ণনা আছে। জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশাল জনসভায় মানুষ যেন শুধু মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই, এক ধরনের উচ্ছ্বাসে তারা বাতাসে ভেসে আছে—পতাকার সমুদ্র, হাতের ইশারা, মুখে স্লোগান, সব মিলিয়ে এক জীবন্ত রাজনৈতিক আবহ লেখক অত্যন্ত জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন। স্টেডিয়ামের গ্যালারি, গাছের ডাল, এমনকি আশপাশের ছাদগুলোও মানুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে ওঠা এবং নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা পর নেত্রীর আগমনে জনসমুদ্রের আরও উত্তাল হয়ে ওঠার বর্ণনায় একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রতিটি মুহূর্তকে ধারণ করার প্রয়াস স্পষ্ট। অন্যদিকে ‘ছাত্রনেতা থেকে জনগণের নেতা: জি. কে. গউছের গল্প আমার চোখে’ শীর্ষক রচনায় স্থানীয় রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের বিবর্তন লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে, আর ‘হবিগঞ্জ থেকে মতিঝিল’ শীর্ষক অধ্যায়ে স্থানীয় ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রের সংযোগসূত্র অনুসন্ধান করা হয়েছে। এই
অধ্যায়গুলো প্রমাণ করে যে লেখক কেবল ঘটনার নিরপেক্ষ বর্ণনাকারী নন, বরং তিনি সেই সময়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রত্যক্ষদর্শী এবং অনেকাংশে অংশগ্রহণকারীও বটে। জাতীয় রাজনীতির বড়ো বড়ো ঘটনা যখন সাধারণত রাজধানীকেন্দ্রিক বিবরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন হবিগঞ্জের মতো একটি জেলা
শহর থেকে সেসব ঘটনার প্রতিফলন কেমন ছিল, তার একটি বিরল দলিল হয়ে উঠেছে এই অধ্যায়গুলো।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক বন্ধনের দিকটিও গ্রন্থে উপেক্ষিত হয়নি। ‘বড়দা থেকে মেজদা হওয়ার গল্প’ শীর্ষক অধ্যায়ে পারিবারিক সম্বোধনের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে জীবনের পরিবর্তনশীলতা ও সম্পর্কের গভীরতাকে এক স্নিগ্ধ রসিকতার আড়ালে তুলে ধরা হয়েছে, যা বইয়ের অন্যান্য গুরুগম্ভীর অধ্যায়ের পাশে এক প্রশান্তির নিঃশ্বাস হয়ে আসে। ‘এক সন্ধ্যার স্মৃতি: আইন, মানবিকতা ও সম্পর্কের মাধুর্য’ এবং ‘সময় হার মানে কৃতজ্ঞতার কাছে’ শীর্ষক অধ্যায়গুলোতেও মানবিক সম্পর্কের কোমলতা এবং কৃতজ্ঞতার শক্তি নিয়ে লেখকের গভীর অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। ‘ভাঙা স্বপ্ন থেকে নতুন জীবন: চৌধুরী বাজার চৌমুহনা’ এবং ‘স্মৃতির দেয়ালে খোদাই এক দিনের মন্দির’ শীর্ষক রচনাগুলোতে স্থান ও স্মৃতির মেলবন্ধনে ফুটে ওঠা হবিগঞ্জ শহরের একান্ত কিছু ছবি ধরা পড়েছে, যা লেখকের নিজের বেড়ে ওঠা শহরটির
প্রতি গভীর মমত্ববোধেরই প্রকাশ। আর ‘সাংবাদিকতার সংগ্রামে হবিগঞ্জ এক্সপ্রেসের স্মরণীয় অধ্যায়’ রচনাটি লেখকের নিজের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার প্রকাশনা-সংগ্রামের এক আন্তরিক দলিল, যেখানে তরুণ সাংবাদিকদের নিয়ে নতুন একটি পত্রিকা দাঁড় করানোর কষ্টসাধ্য অথচ গর্বের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে।
ভাষা ও রচনাশৈলীর দিক থেকেও বইটি অনন্য। লেখকের ভাষা সহজ, আন্তরিক ও কথোপকথনধর্মী। কোথাও অপ্রয়োজনীয় অলংকারের ভার নেই, আবার কোথাও শুষ্ক তথ্যের একঘেয়েমিও নেই। ফলে পাঠক সহজেই লেখকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন। একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থের জন্য এই স্বাভাবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃত্রিম আড়ম্বর বা অতিরিক্ত সাহিত্যিক কারুকাজ প্রায়ই স্মৃতিকথার সারল্য ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে। চিন্ময় আচার্য এই ফাঁদ এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবে। প্রতিটি ঘটনার শেষে তিনি যেন পাঠককে নীরবে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান—সত্য কী, দায়িত্ব কী, মানবিকতা কোথায়, ক্ষমা কতটা প্রয়োজন, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় কি তাঁর পেশায় নাকি তাঁর নৈতিকতায়? এই প্রশ্নগুলোই বইটির পাঠ-অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে তোলে এবং একে নিছক ঘটনাবিবরণী থেকে দার্শনিক অনুসন্ধানের স্তরে উন্নীত করে। এই গ্রন্থ পাঠ করতে করতে অনুভব করা যায়, স্মৃতি কখনো অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্মৃতি বর্তমানকে আলোকিত করে, ভবিষ্যৎকে সতর্ক করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যখন বৃহত্তর সমাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা সাহিত্য হয়ে ওঠে, আর সেই সাহিত্য সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
বইয়ের শেষ অধ্যায় ‘সুপ্রভাত মিশিগান: এক প্রত্যাবর্তনের আত্মকথা’ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় কীভাবে প্রবাসজীবনের হাজারো ব্যস্ততা আর কম্পিউটার কম্পোজিং, ফটোশপ কিংবা সংবাদপত্রের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও লেখক তাঁর হারানো পেশাকে আবার ফিরে পেতে চেয়েছেন। দীর্ঘ বিরতির পর লেখালেখি ও সম্পাদনায় ফেরা মোটেই সহজ ছিল না; প্রতিটি কাজই ছিল ধীর, জটিল এবং অনেক সময় হতাশাজনক, তাই ধৈর্য ধরে ধাপে ধাপে নিজেকে নতুন করে শিখতে হয়েছে লেখককে। মিশিগানের জনপ্রিয় দৈনিক ‘দ্য ডেট্রয়েট নিউজ’-এর কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় সংবাদ অনুবাদ করে প্রকাশের অনুমতি প্রার্থনা করেন তিনি, আর সেই অনুমতি পাওয়াকে নিজের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ও সৌভাগ্য বলে মনে করেন। এই সহযোগিতাই ‘সুপ্রভাত মিশিগান’-এর অগ্রযাত্রাকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়, আর আজ পোর্টালটি আট বছর পূর্ণ করেছে, যা লেখকের ভাষায় প্রতিদিনের লড়াই, রাত জাগা ক্লান্তি এবং দায়িত্বের এক অবিরাম গল্প। আট ঘণ্টার কর্মজীবনের পর পরিবারের দায়িত্ব সামলে ক্লান্ত শরীরে আবার নিউজ আপডেট করার এই নীরব যুদ্ধ বাইরে থেকে দেখা যায় না, অথচ এতে আছে কষ্ট, ক্লান্তি, আর গভীর তৃপ্তিও।
প্রবাসজীবনেও সাংবাদিকতাকে ধরে রাখার এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে তাঁর কাছে এই পেশা কখনোই নিছক জীবিকা ছিল না; এটি তাঁর আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হারিয়ে যাওয়া পেশাকে নতুন করে ফিরে পাওয়া এবং সেটিকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করাকেই লেখক তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো অর্জন বলে উল্লেখ করেছেন, যা বইয়ের সামগ্রিক বার্তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এক আবেগঘন সমাপ্তি টেনে দেয়।
গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ অংশটিও লক্ষণীয়। মূল বাংলা রচনার প্রতিটি অধ্যায়ের ইংরেজি রূপান্তর যুক্ত করে বইটিকে একটি সম্পূর্ণ দ্বিভাষিক গ্রন্থে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যেখানে অনুবাদের ভাষাও মূলানুগ ও সাবলীল, মূল রচনার আবেগ ও তথ্যনিষ্ঠতাকে যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রেখেছে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলা ভাষায় স্বচ্ছন্দ নন এমন নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে, কিংবা আন্তর্জাতিক গবেষক ও সাংবাদিকতা- শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার এই ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অনুবাদ- প্রয়াস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মনে হয়।
একজন প্রবাসী সাংবাদিক হিসেবে লেখক নিজেই যেহেতু ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে যোগাযোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে, তাই এই দ্বিভাষিক
কাঠামো তাঁর নিজস্ব জীবনদর্শনেরই সম্প্রসারণ বলা যায়। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ একটি বহুমাত্রিক গ্রন্থ, যেখানে ব্যক্তিগত
আবেগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও নৈতিক দ্বন্দ্ব একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। এর সবচেয়ে বড়ো সীমাবদ্ধতা হয়তো এই যে, খণ্ড খণ্ড অধ্যায়ের কাঠামোর কারণে কোনো একক ধারাবাহিক আখ্যান পাওয়া যায় না; কালানুক্রমও সব সময় স্পষ্ট নয়, ফলে যে পাঠক একটি সুবিন্যস্ত জীবনী-আখ্যান আশা করবেন, তাঁকে কিছুটা মানিয়ে নিতে হবে এই মোজাইক-সদৃশ গঠনের সঙ্গে। কিছু কিছু অধ্যায় তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, ফলে কোনো কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট পাঠকের কাছে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। তবে এই সীমাবদ্ধতা বইটির মূল্যকে খুব একটা খর্ব করে না, কারণ প্রতিটি অধ্যায় নিজের ভেতরেই সম্পূর্ণ এবং শক্তিশালী, আর সামগ্রিকভাবে পড়লে একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ জীবনযাত্রার একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিচ্ছবি ঠিকই ফুটে ওঠে। বরং এই খণ্ডিত কাঠামোই বইটিকে এক ধরনের নমনীয়তা দিয়েছে—পাঠক চাইলে যেকোনো অধ্যায় স্বতন্ত্র প্রবন্ধ হিসেবেও পড়তে পারেন, আবার গোটা বই একসঙ্গে পড়লে একটি সামগ্রিক
জীবনদর্শনও খুঁজে পাবেন।
যাঁরা সাংবাদিকতার ইতিহাস জানতে চান, যাঁরা মানুষের গল্প শুনতে ভালোবাসেন, যাঁরা স্মৃতির ভেতরে সময়ের স্পন্দন খুঁজে পান এবং যাঁরা এখনও বিশ্বাস করেন যে কলম সত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা, তাঁদের জন্য এই গ্রন্থ এক অনিবার্য পাঠ। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন স্মৃতির আলপনায় আঁকা সময়ের মুখচ্ছবি। সেই মুখচ্ছবির ভেতরে আছে একজন মানুষের জীবন, একটি সমাজের বিবর্তন এবং একটি দেশের দীর্ঘ পথচলার অনুরণন। তাই বলা যায়, ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ কেবল একটি স্মৃতিকথা নয়; এটি স্মৃতি, সত্য, সাহস ও মানবিকতার সম্মিলিত জীবনদলিল। বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে, একজন সৎ ও সংবেদনশীল মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা হিসেবে এবং প্রবাসজীবনেও নিজের শিকড় ও পেশার প্রতি অবিচল থাকার এক অনুপ্রেরণাদায়ী আখ্যান হিসেবে ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ দীর্ঘদিন পাঠকের মনে জায়গা করে নেবে।
লেখক পরিচিতি :
মিহিরকান্তি চৌধুরী
লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার সিলেট।
প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ, বইয়ের গায়ে মূল্য লেখা সাড়ে সাতশ টাকা, আর আন্তর্জাতিক মান বইপত্র নম্বর সংযুক্ত থাকার বিষয়টিও প্রমাণ করে প্রকাশনাটি নিছক পারিবারিক স্মারক নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ও সাহিত্যিক প্রকাশনা হিসেবেই সাজানো হয়েছে। বইটির উৎসর্গপত্রে লেখক তাঁর প্রয়াত বাবা চিত্ত রঞ্জন আচার্য ও মা শেফালী রানী আচার্যকে স্মরণ করেছেন, যা প্রথম পাতা থেকেই বইটির সুর নির্ধারণ করে দেয়—এটি হবে গভীরভাবে ব্যক্তিগত, অথচ একই সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতায় পরিপূর্ণ এক আখ্যান।
বাংলা মূল রচনার পাশাপাশি গ্রন্থটিতে সম্পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদও সংযুক্ত করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই চেয়েছেন এই স্মৃতিকথা কেবল বাংলাভাষী পাঠকের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে প্রবাসী বাঙালি প্রজন্ম ও আন্তর্জাতিক পাঠকসমাজের কাছেও পৌঁছাক। এই দ্বিভাষিক কাঠামোই বইটিকে একটি সাধারণ স্মৃতিকথার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চাভিলাষী একটি প্রকল্পে পরিণত করেছে, কারণ লেখক নিজে দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে উপলব্ধি করেছেন যে দেশ ছেড়ে যাওয়া প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজিতেও নিজের শিকড়ের গল্প পৌঁছে দেওয়া কতটা জরুরি।
বইয়ের শুরুতে সাংবাদিক ও লেখক অপূর্ব শর্মার লেখা যে ভূমিকা সংযুক্ত হয়েছে, তা এই গ্রন্থের চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে অনেকখানি। তিনি লিখেছেন, মানুষের জীবন কেবল দিনপঞ্জির হিসাব নয়; জীবন আসলে স্মৃতির দীর্ঘ নদী, যা ব্যক্তিগত বেদনা, আনন্দ ও সংগ্রামের ঢেউ বহন করে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের উপকূলে এসে মেশে। যে মানুষ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেন, অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে আসেন, সমাজের পরিবর্তনকে কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থেকে সময়কে ধারণ করেন, তাঁর স্মৃতিচারণ কখনও নিছক আত্মকথা হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, একটি সময়ের দলিল, একটি জাতির চলমান ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য অনুষজ্ঞ।
চিন্ময় আচার্যের এই গ্রন্থ সেই নদীরই একটি দলিল, যেখানে ব্যক্তিগত জীবনকথা ক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে একটি সমাজের প্রতিচ্ছবিতে। ভূমিকাকার যথার্থই
লক্ষ করেছেন যে বইটির সবচেয়ে বড়ো শক্তি এর নির্মোহ সততা। লেখক কোথাও নিজেকে বীর বা নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেননি; বরং নিজের দ্বিধা, ব্যর্থতা, ভুল সিদ্ধান্ত, আত্মসমালোচনা ও অনুশোচনাকেও সমান সাহসের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন। এই আত্মসমালোচনামূলক সততা বাংলা স্মৃতিকথার ধারায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন, কারণ প্রকৃত স্মৃতিকথা কখনও আত্মপ্রশস্তির গ্রন্থ হয়ে ওঠে না; তা হয়ে ওঠে আত্মসমীক্ষার আয়না। ভূমিকাকার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রেখেছেন—বইটির ভাষা সহজ, আন্তরিক ও কথোপকথনধর্মী, কোথাও অপ্রয়োজনীয় অলংকারের ভার নেই, আবার কোথাও শুষ্ক তথ্যের একঘেয়েমিও নেই, ফলে পাঠক সহজেই লেখকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন।
গ্রন্থের সূচিপত্রের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি কোনো ধারাবাহিক কালানুক্রমিক আত্মজীবনী নয়; বরং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর নির্বাচিত স্মৃতিচারণ, যা সাঁইত্রিশটি স্বতন্ত্র রচনায় বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায় নিজের মধ্যেই একটি সম্পূর্ণ গল্প, যার নিজস্ব সূচনা, দ্বন্দ্ব ও পরিণতি রয়েছে। এই খণ্ড খণ্ড কাঠামো বইটিকে একদিক থেকে পড়তে সহজ করে তুলেছে—পাঠক যেকোনো অধ্যায় থেকে শুরু করতে পারেন—আবার অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে পড়লে বোঝা যায় কীভাবে এই টুকরো টুকরো স্মৃতি একত্রে একজন মানুষের সাংবাদিকতা-জীবনের সম্পূর্ণ চিত্র নির্মাণ করে। লেখকের নিজের ভাষায়, এই গ্রন্থ তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের পথচলারই এক আন্তরিক প্রতিফলন—চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেখা মানুষ, প্রত্যক্ষ করা ঘটনা, সমাজের পরিবর্তন, অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তের কিছু
নির্বাচিত অধ্যায় এখানে স্থান পেয়েছে। লেখক নিজেই স্বীকার করেছেন যে সাংবাদিকতার পথ কখনোই সহজ ছিল না, নানা প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেও তিনি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্যুত হননি, আর এই বই সেই দায়বদ্ধতারই ফসল।
লেখকের কথায় প্রকাশিত জীবনপঞ্জি অনুসারে, চিন্ময় আচার্যের জন্ম ১৯৬০ সালের ৩ মে হবিগঞ্জ জেলা শহরে। তিনি স্বর্গীয় চিত্ত রঞ্জন আচার্য ও স্বর্গীয় শেফালী রানী আচার্যের দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর পিতৃভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার খান্দুরা গ্রামে, আর মাতুলালয় একই উপজেলার ফান্দাউক গ্রামে অবস্থিত। স্কুলজীবনেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা হয় এবং বৃন্দাবন সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সাহিত্য সংকলন ‘রানার’ শিক্ষাঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছিল। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ, মানুষের জীবন ও সমাজের নানা বাস্তবতা তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার পেশায় নিয়ে আসে। ১৯৭৮ সালে ঢাকায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘নয়াবার্তা’ পত্রিকায় হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
সেই সময়ে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা বা ডিজিটাল প্রযুক্তির কোনো সুবিধা ছিল না; সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই ও প্রতিবেদন পাঠানোর প্রতিটি ধাপই ছিল শ্রমসাধ্য। কিন্তু সংবাদ ও মানুষের জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরার গভীর দায়বোধ, পেশার প্রতি নিষ্ঠা এবং লেখনীর শক্তির প্রতি বিশ্বাস তাঁকে প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। এরপর ১৯৮০ সালে যশোর থেকে প্রকাশিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক ‘স্ফুলিঙ্গ’-এ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ব্যুরো চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি দৈনিক ‘স্বাধীনতা’, ‘নয়াবাংলা’, ‘জালালাবাদী’, সাপ্তাহিক ‘সিলেট সমাচার’, দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ ও দৈনিক ‘জনতা’সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৮২ সালে হবিগঞ্জ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘স্বাধিকার’ পত্রিকায় বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। এছাড়াও সাপ্তাহিক ‘দৃষ্টিকোণ’ ও ‘হবিগঞ্জ সমাচার’ পত্রিকার সম্পাদনা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত থেকে সংবাদ সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি, আর ১৯৯৭ সালে হবিগঞ্জের প্রথম দৈনিক পত্রিকা ‘প্রতিদিনের বাণী’ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০০২ সালে সেই পত্রিকা থেকে পদত্যাগের পর একই বছরের ২ আগস্ট তরুণ সংবাদকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন দৈনিক ‘হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস’, যা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের নিয়ে তাঁর সাংবাদিকতা ও প্রকাশনা জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ প্রবাস জীবনেও বহু বছর নিজের পেশা থেকে দূরে থাকলেও সংবাদ ও লেখালেখির প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনোই কমেনি, আর সন্তানদের তাগিদে এবং নিজের ভেতরের সুপ্ত সাংবাদিকতাসত্তার অনুপ্রেরণায় তিনি আবার সংবাদচর্চার জগতে ফিরে আসেন। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে বসবাসকালেও সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর টান কমেনি; সেখান থেকে তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘সুপ্রভাত মিশিগান’-এর যাত্রা শুরু করেন, যা আজ আট বছর পূর্ণ করেছে। এই দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি বাঁক বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, ফলে গ্রন্থটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ও বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হয়ে উঠেছে।
বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘স্মৃতির ভেতর বাবার নিঃশব্দ আশীর্বাদ’ দিয়েই লেখক পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেন। বাবা নেই বহু বছর, তবু লেখকের মনে হয় তিনি প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে আছেন—নিঃশব্দ আশীর্বাদের মতো, দৃশ্যমান নন অথচ অদৃশ্য উপস্থিতিতে আজও তিনি লেখকের চলার পথের সঙ্গী। এই অধ্যায়ে ফুটে ওঠে এক
জটিল অথচ গভীর সম্পর্কের ছবি: বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সম্মানজনক ও নিরাপদ কোনো পেশায় নিজেকে গড়ে তুলুক, কিন্তু ছেলে বেছে নিলেন সাংবাদিকতা—বাবার স্বপ্নের ঠিক বিপরীত এক পথ। বাবা এই পেশাকে কখনোই ভালো চোখে দেখেননি এবং বারবার সতর্ক করতেন
যে সাংবাদিকতা বিপজ্জনক পেশা, সত্য লিখতে গিয়ে একদিন না একদিন বড়ো বিপদে পড়তে হতে পারে, এমনকি জীবনও চলে যেতে পারে। এই দ্বন্দ্ব শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের সমাজেরই এক চিরন্তন বাস্তবতা, যেখানে সন্তানের আদর্শনিষ্ঠা আর অভিভাবকের নিরাপত্তা-উদ্বেগ মুখোমুখি দাঁড়ায়। লেখক
অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর আবেগে সেই সম্পর্ককে নির্মাণ করেছেন, যা বইয়ের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশগুলোর একটি এবং একই সঙ্গে একজন সন্তানের অপরিসীম কৃতজ্ঞতা ও আবেগ এবং একটি প্রজন্মের পারিবারিক মূল্যবোধেরও প্রতিফলন।
গ্রন্থের কেন্দ্রীয় সুর হলো সাংবাদিকতার নৈতিক দ্বন্দ্ব ও ঝুঁকি। ‘সত্যের পথে বন্ধুত্বের পরীক্ষা: হবিগঞ্জে শিশু খাদ্য কেলেঙ্কারি’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক বর্ণনা করেছেন কীভাবে নব্বইয়ের দশকে তাঁর ছেলেবেলার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যিনি জীবদ্দশায় প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক ছিলেন, শিশু খাদ্যের একটি চালান গোপনে কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। হবিগঞ্জের একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এই দুর্নীতির তথ্য লেখকের হাতে তুলে দেন, আর তথ্য যাচাইয়ের সময় সেই বন্ধু নিজে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা নানাভাবে অনুরোধ করেছিলেন যেন সংবাদটি প্রকাশ না করা হয়; এমনকি সীমাহীন অর্থের প্রলোভনও দেখানো হয়েছিল। লেখক লিখেছেন, দুর্নীতি, অনিয়ম বা অন্যায় যখন সমাজের বাতাসকে দূষিত করে তোলে, তখন নীরবতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড়ো সহায়তা, আর তিনি সেই নীরবতার অংশ হতে চাননি—মানুষ যত ঘনিষ্ঠই হোক, সম্পর্ক যত পুরোনোই হোক, সত্যের সামনে কোনো পক্ষপাত তিনি করেননি। এই অধ্যায়টি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে সাংবাদিকতা কেবল তথ্য সংগ্রহের পেশা নয়; এটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পেশাগত দায়বদ্ধতার মধ্যে প্রতিনিয়ত এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন।
একই সুরের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ‘বন্ধুত্ব বনাম দায়িত্ব: সাংবাদিকতার কঠিন বাস্তবতা’ ও ‘বন্ধুত্ব, সাংবাদিকতা ও সিঁথি: একটি জীবনের অমূল্য অধ্যায়’ শীর্ষক রচনাগুলোতেও, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর পেশাগত সততার টানাপোড়েন বারবার ফিরে আসে। ‘গুড়ের আড়ালে ভেজাল’ শীর্ষক অধ্যায়টিও একই ধারার—খাদ্যপণ্যে ভেজাল মেশানোর মতো অতি সাধারণ অথচ জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর অপরাধ কীভাবে একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধানী দৃষ্টির সামনে উন্মোচিত হয়, তারই একটি দৃষ্টান্ত এখানে ফুটে উঠেছে। এই অধ্যায়গুলো একত্রে প্রমাণ করে যে লেখকের কাছে সততা কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়, বরং প্রতিদিনের বাস্তব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে অর্জন করা এক কঠিন অনুশীলন।
সাংবাদিকতার পথে হুমকি ও ঝুঁকির বর্ণনাও বইটির অন্যতম শক্তিশালী দিক। ‘জীবন্ত কবরের হুমকি’ শীর্ষক অধ্যায়ে লেখক স্মরণ করেছেন আশির দশকের এক অভিজ্ঞতা, যখন সাপ্তাহিক ‘দৃষ্টিকোণ’-এ কর্মরত থাকাকালীন চুনারুঘাটের আলোচিত ‘চুন্নু হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে স্বনামে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তিনি, যা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলে তীব্র আলোড়ন তোলে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর একের পর এক হুমকি আসতে থাকে, এমনকি ‘জীবন্ত কবর দেওয়ার’ মতো নৃশংস হুমকিও তাঁকে শুনতে হয়। তবু কলম থামাননি তিনি, ভয়কে অতিক্রম করেই প্রতিবেদন লেখা অব্যাহত রাখেন। এই সাহসের পেছনে সবচেয়ে বড়ো প্রেরণা
ছিলেন তাঁদের সাহসী প্রবীণ সম্পাদক প্রয়াত নোমান চৌধুরী, যিনি কেবল একজন সম্পাদক ছিলেন না, ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল এক অভিভাবক, যাঁর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল হুমকির কাছে মাথা নত না হয়ে তথ্যের কাছে দায়বদ্ধ থাকাই সাংবাদিকতার মূল শপথ। এই সংকটকালে স্থানীয় আরেকজন মানুষের মানবিক ভূমিকার
কথাও লেখক কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন—একজন আইনজীবী, যিনি নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর রাখতেন এবং সাহস জোগাতেন, আর লেখকের মামাও ছিলেন এক অটল আশ্রয়, যিনি স্পষ্ট ভাষায় বলতেন, সত্যের পথে থাকলে কেউ একা থাকে না।
অনুরূপ নাটকীয় এক অভিজ্ঞতার বর্ণনা মেলে ‘চিন্ময়, বাসা থেকে সরে যা, তোকে গ্রেফতার করতে আসছি’ শীর্ষক অধ্যায়ে, যেখানে এসএসসি পরীক্ষার ইতিহাস বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জেরে—যা একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে হবিগঞ্জে সংঘটিত হয় এবং দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়—লেখককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল, কারণ প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের পরিবারের একজন সদস্যের সংশ্লিষ্টতার গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল। থানার তৎকালীন ওসি, যিনি ব্যক্তিগতভাবে লেখকের বন্ধু ছিলেন, অসহায় কণ্ঠে ফোন করে জানান যে এটি সরাসরি জেলা প্রশাসকের নির্দেশ এবং তাঁর কিছু করার নেই; লেখক মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাসা থেকে সরে যান, যদিও অল্প
সময়ের মধ্যেই ঘটনার মোড় বদলে যায় এবং প্রশাসনিক চাপে জেলা প্রশাসক সেই নির্দেশ প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এই ধরনের অধ্যায়গুলো স্পষ্ট করে দেয় যে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার পথ কখনও মসৃণ ছিল না; সত্য প্রকাশের মূল্য অনেক সময় ভয়, হুমকি, সামাজিক চাপ এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দিয়েও
দিতে হয়েছে, আর একজন সংবাদকর্মীকে যেতে হয়েছে অদেখা এক ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার ভেতর দিয়ে।
গ্রন্থের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতা ও প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকতার সংঘাত। ‘প্রশাসনের রোষে সাংবাদিকতা ও ন্যায়ের জয়’, ‘রক্ষকই যখন ভক্ষক: এক স্মৃতিকথা’ এবং ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গল্প’—এই অধ্যায়গুলো একত্রে দেখায় কীভাবে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল বা এমনকি
আইনরক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ সত্য প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর লেখক প্রতিবারই পেশাগত সততা বজায় রেখে সেসব বাধা অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন।
‘সাংবাদিকতার ঝুঁকি ও সামাজিক দায়: এক বাস্তব অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক অধ্যায়টিও এই ধারাবাহিকতারই অংশ, যেখানে সংবাদকর্মীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা আর সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার মধ্যেকার টানাপোড়েন তুলে ধরা হয়েছে। এই আখ্যানগুলোর গুরুত্ব এখানেই যে, রাজধানীকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার বাইরে জেলা শহরের সংবাদকর্মীদের জীবনসংগ্রাম, সীমাবদ্ধতা, দায়িত্ববোধ ও সাহসের যে ইতিহাস প্রায়ই অপ্রকাশিত থেকে যায়, লেখক তারই একটি মূল্যবান বিবরণ উপস্থাপন করেছেন নির্মোহভাবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাস রচনায় এই ধরনের স্মৃতিকথা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে গ্রন্থের গুরুত্ব শুধু সাংবাদিকতার ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত মানুষের বই। এখানে মানুষের হাসি আছে, কান্না আছে; বন্ধুত্ব আছে, বিশ্বাসঘাতকতা আছে; আদর্শ আছে, আপস আছে; মৃত্যু আছে, বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষা আছে।
‘জগদীশ মোদক: হবিগঞ্জের মানবিক এক আলোকবর্তিকা’, ‘হবিগঞ্জের ডা. মো. জমির আলী: হৃদয় ছোঁয়া এক চিকিৎসকের গল্প’, ‘অবিচল সাহসী যোদ্ধা: স্বপ্না চক্রবর্তীর সংগ্রামের গল্প’, ‘ন্যায় ও সাহসিকতার প্রতীক: আমীর হোসেন’, ‘স্মৃতির আলোয় সৈয়দ মোঃ ফয়সল’ এবং ‘বন্ধুবর মিলন রশীদ: সাংবাদিকতার পথে এক সহযাত্রী’—এই অধ্যায়গুলোতে লেখক তাঁর চারপাশে থাকা সাধারণ ও অসাধারণ মানুষদের প্রতিকৃতি এঁকেছেন গভীর মমতায়।
একজন পুলিশ সুপারের স্মৃতিচারণ থেকে শুরু করে সমাজসেবী, চিকিৎসক ও সংগ্রামী নারীর জীবনকথা পর্যন্ত—প্রতিটি চরিত্র বাস্তব, প্রতিটি ঘটনা জীবনঘনিষ্ঠ।
লেখক মানুষকে যেভাবে দেখেছেন, তাতে বিচার করার চেয়ে বোঝার প্রচেষ্টাই বেশি প্রতিফলিত হয়েছে। ‘২০ টাকার কুপন থেকে ২০ হাজার টাকার মানবিক দান’ শীর্ষক অধ্যায়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এখানে একটি অতি সামান্য ঘটনার মধ্য দিয়ে মানবিকতার বিস্তৃত পরিসর তুলে ধরা হয়েছে—কীভাবে সামান্য একটি
উদ্যোগ ক্রমে বড়ো মানবিক সহায়তায় রূপান্তরিত হতে পারে, তারই একটি দৃষ্টান্ত এই রচনা। একইভাবে ‘একটি বিবেকী স্বীকারোক্তি’ ও ‘শান্তির পথে সমাধান’ শীর্ষক অধ্যায় দুটিতে বিবেকের দংশন, অনুশোচনা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে সমস্যার সমাধান খোঁজার প্রয়াস প্রতিফলিত হয়েছে, যা লেখকের সাংবাদিকতাকে নিছক তথ্য প্রকাশের কাজ না রেখে মানবিক মধ্যস্থতার একটি ভূমিকাতেও উন্নীত করে। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রন্থটিকে কেবল সাংবাদিকতার দলিল না রেখে একটি হৃদয়গ্রাহী সমাজচিত্রে রূপান্তরিত করেছে।
রাজনৈতিক ইতিহাসের দিক থেকেও বইটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘শেখ হাসিনা ও সংবাদ প্রতিবেদনের নীরব দ্বন্দ্ব’ শীর্ষক অধ্যায়ে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার হবিগঞ্জ সফরের বর্ণনা আছে। জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত বিশাল জনসভায় মানুষ যেন শুধু মাটিতে দাঁড়িয়ে নেই, এক ধরনের উচ্ছ্বাসে তারা বাতাসে ভেসে আছে—পতাকার সমুদ্র, হাতের ইশারা, মুখে স্লোগান, সব মিলিয়ে এক জীবন্ত রাজনৈতিক আবহ লেখক অত্যন্ত জীবন্তভাবে তুলে ধরেছেন। স্টেডিয়ামের গ্যালারি, গাছের ডাল, এমনকি আশপাশের ছাদগুলোও মানুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে ওঠা এবং নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা পর নেত্রীর আগমনে জনসমুদ্রের আরও উত্তাল হয়ে ওঠার বর্ণনায় একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রতিটি মুহূর্তকে ধারণ করার প্রয়াস স্পষ্ট। অন্যদিকে ‘ছাত্রনেতা থেকে জনগণের নেতা: জি. কে. গউছের গল্প আমার চোখে’ শীর্ষক রচনায় স্থানীয় রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের বিবর্তন লেখকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে, আর ‘হবিগঞ্জ থেকে মতিঝিল’ শীর্ষক অধ্যায়ে স্থানীয় ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রের সংযোগসূত্র অনুসন্ধান করা হয়েছে। এই
অধ্যায়গুলো প্রমাণ করে যে লেখক কেবল ঘটনার নিরপেক্ষ বর্ণনাকারী নন, বরং তিনি সেই সময়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রত্যক্ষদর্শী এবং অনেকাংশে অংশগ্রহণকারীও বটে। জাতীয় রাজনীতির বড়ো বড়ো ঘটনা যখন সাধারণত রাজধানীকেন্দ্রিক বিবরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন হবিগঞ্জের মতো একটি জেলা
শহর থেকে সেসব ঘটনার প্রতিফলন কেমন ছিল, তার একটি বিরল দলিল হয়ে উঠেছে এই অধ্যায়গুলো।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক বন্ধনের দিকটিও গ্রন্থে উপেক্ষিত হয়নি। ‘বড়দা থেকে মেজদা হওয়ার গল্প’ শীর্ষক অধ্যায়ে পারিবারিক সম্বোধনের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে জীবনের পরিবর্তনশীলতা ও সম্পর্কের গভীরতাকে এক স্নিগ্ধ রসিকতার আড়ালে তুলে ধরা হয়েছে, যা বইয়ের অন্যান্য গুরুগম্ভীর অধ্যায়ের পাশে এক প্রশান্তির নিঃশ্বাস হয়ে আসে। ‘এক সন্ধ্যার স্মৃতি: আইন, মানবিকতা ও সম্পর্কের মাধুর্য’ এবং ‘সময় হার মানে কৃতজ্ঞতার কাছে’ শীর্ষক অধ্যায়গুলোতেও মানবিক সম্পর্কের কোমলতা এবং কৃতজ্ঞতার শক্তি নিয়ে লেখকের গভীর অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। ‘ভাঙা স্বপ্ন থেকে নতুন জীবন: চৌধুরী বাজার চৌমুহনা’ এবং ‘স্মৃতির দেয়ালে খোদাই এক দিনের মন্দির’ শীর্ষক রচনাগুলোতে স্থান ও স্মৃতির মেলবন্ধনে ফুটে ওঠা হবিগঞ্জ শহরের একান্ত কিছু ছবি ধরা পড়েছে, যা লেখকের নিজের বেড়ে ওঠা শহরটির
প্রতি গভীর মমত্ববোধেরই প্রকাশ। আর ‘সাংবাদিকতার সংগ্রামে হবিগঞ্জ এক্সপ্রেসের স্মরণীয় অধ্যায়’ রচনাটি লেখকের নিজের প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার প্রকাশনা-সংগ্রামের এক আন্তরিক দলিল, যেখানে তরুণ সাংবাদিকদের নিয়ে নতুন একটি পত্রিকা দাঁড় করানোর কষ্টসাধ্য অথচ গর্বের অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে।
ভাষা ও রচনাশৈলীর দিক থেকেও বইটি অনন্য। লেখকের ভাষা সহজ, আন্তরিক ও কথোপকথনধর্মী। কোথাও অপ্রয়োজনীয় অলংকারের ভার নেই, আবার কোথাও শুষ্ক তথ্যের একঘেয়েমিও নেই। ফলে পাঠক সহজেই লেখকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন। একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থের জন্য এই স্বাভাবিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃত্রিম আড়ম্বর বা অতিরিক্ত সাহিত্যিক কারুকাজ প্রায়ই স্মৃতিকথার সারল্য ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে। চিন্ময় আচার্য এই ফাঁদ এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবে। প্রতিটি ঘটনার শেষে তিনি যেন পাঠককে নীরবে একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করান—সত্য কী, দায়িত্ব কী, মানবিকতা কোথায়, ক্ষমা কতটা প্রয়োজন, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় কি তাঁর পেশায় নাকি তাঁর নৈতিকতায়? এই প্রশ্নগুলোই বইটির পাঠ-অভিজ্ঞতাকে আরও গভীর করে তোলে এবং একে নিছক ঘটনাবিবরণী থেকে দার্শনিক অনুসন্ধানের স্তরে উন্নীত করে। এই গ্রন্থ পাঠ করতে করতে অনুভব করা যায়, স্মৃতি কখনো অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; স্মৃতি বর্তমানকে আলোকিত করে, ভবিষ্যৎকে সতর্ক করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যখন বৃহত্তর সমাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা সাহিত্য হয়ে ওঠে, আর সেই সাহিত্য সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
বইয়ের শেষ অধ্যায় ‘সুপ্রভাত মিশিগান: এক প্রত্যাবর্তনের আত্মকথা’ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় কীভাবে প্রবাসজীবনের হাজারো ব্যস্ততা আর কম্পিউটার কম্পোজিং, ফটোশপ কিংবা সংবাদপত্রের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েও লেখক তাঁর হারানো পেশাকে আবার ফিরে পেতে চেয়েছেন। দীর্ঘ বিরতির পর লেখালেখি ও সম্পাদনায় ফেরা মোটেই সহজ ছিল না; প্রতিটি কাজই ছিল ধীর, জটিল এবং অনেক সময় হতাশাজনক, তাই ধৈর্য ধরে ধাপে ধাপে নিজেকে নতুন করে শিখতে হয়েছে লেখককে। মিশিগানের জনপ্রিয় দৈনিক ‘দ্য ডেট্রয়েট নিউজ’-এর কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় সংবাদ অনুবাদ করে প্রকাশের অনুমতি প্রার্থনা করেন তিনি, আর সেই অনুমতি পাওয়াকে নিজের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ও সৌভাগ্য বলে মনে করেন। এই সহযোগিতাই ‘সুপ্রভাত মিশিগান’-এর অগ্রযাত্রাকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়, আর আজ পোর্টালটি আট বছর পূর্ণ করেছে, যা লেখকের ভাষায় প্রতিদিনের লড়াই, রাত জাগা ক্লান্তি এবং দায়িত্বের এক অবিরাম গল্প। আট ঘণ্টার কর্মজীবনের পর পরিবারের দায়িত্ব সামলে ক্লান্ত শরীরে আবার নিউজ আপডেট করার এই নীরব যুদ্ধ বাইরে থেকে দেখা যায় না, অথচ এতে আছে কষ্ট, ক্লান্তি, আর গভীর তৃপ্তিও।
প্রবাসজীবনেও সাংবাদিকতাকে ধরে রাখার এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে তাঁর কাছে এই পেশা কখনোই নিছক জীবিকা ছিল না; এটি তাঁর আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হারিয়ে যাওয়া পেশাকে নতুন করে ফিরে পাওয়া এবং সেটিকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করাকেই লেখক তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো অর্জন বলে উল্লেখ করেছেন, যা বইয়ের সামগ্রিক বার্তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এক আবেগঘন সমাপ্তি টেনে দেয়।
গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ অংশটিও লক্ষণীয়। মূল বাংলা রচনার প্রতিটি অধ্যায়ের ইংরেজি রূপান্তর যুক্ত করে বইটিকে একটি সম্পূর্ণ দ্বিভাষিক গ্রন্থে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যেখানে অনুবাদের ভাষাও মূলানুগ ও সাবলীল, মূল রচনার আবেগ ও তথ্যনিষ্ঠতাকে যথাসম্ভব অক্ষুণ্ন রেখেছে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা বাংলা ভাষায় স্বচ্ছন্দ নন এমন নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে, কিংবা আন্তর্জাতিক গবেষক ও সাংবাদিকতা- শিক্ষার্থীদের কাছে বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার এই ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অনুবাদ- প্রয়াস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মনে হয়।
একজন প্রবাসী সাংবাদিক হিসেবে লেখক নিজেই যেহেতু ভাষা ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে যোগাযোগের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে, তাই এই দ্বিভাষিক
কাঠামো তাঁর নিজস্ব জীবনদর্শনেরই সম্প্রসারণ বলা যায়। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ একটি বহুমাত্রিক গ্রন্থ, যেখানে ব্যক্তিগত
আবেগ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও নৈতিক দ্বন্দ্ব একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। এর সবচেয়ে বড়ো সীমাবদ্ধতা হয়তো এই যে, খণ্ড খণ্ড অধ্যায়ের কাঠামোর কারণে কোনো একক ধারাবাহিক আখ্যান পাওয়া যায় না; কালানুক্রমও সব সময় স্পষ্ট নয়, ফলে যে পাঠক একটি সুবিন্যস্ত জীবনী-আখ্যান আশা করবেন, তাঁকে কিছুটা মানিয়ে নিতে হবে এই মোজাইক-সদৃশ গঠনের সঙ্গে। কিছু কিছু অধ্যায় তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, ফলে কোনো কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট পাঠকের কাছে অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। তবে এই সীমাবদ্ধতা বইটির মূল্যকে খুব একটা খর্ব করে না, কারণ প্রতিটি অধ্যায় নিজের ভেতরেই সম্পূর্ণ এবং শক্তিশালী, আর সামগ্রিকভাবে পড়লে একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ জীবনযাত্রার একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিচ্ছবি ঠিকই ফুটে ওঠে। বরং এই খণ্ডিত কাঠামোই বইটিকে এক ধরনের নমনীয়তা দিয়েছে—পাঠক চাইলে যেকোনো অধ্যায় স্বতন্ত্র প্রবন্ধ হিসেবেও পড়তে পারেন, আবার গোটা বই একসঙ্গে পড়লে একটি সামগ্রিক
জীবনদর্শনও খুঁজে পাবেন।
যাঁরা সাংবাদিকতার ইতিহাস জানতে চান, যাঁরা মানুষের গল্প শুনতে ভালোবাসেন, যাঁরা স্মৃতির ভেতরে সময়ের স্পন্দন খুঁজে পান এবং যাঁরা এখনও বিশ্বাস করেন যে কলম সত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা, তাঁদের জন্য এই গ্রন্থ এক অনিবার্য পাঠ। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন স্মৃতির আলপনায় আঁকা সময়ের মুখচ্ছবি। সেই মুখচ্ছবির ভেতরে আছে একজন মানুষের জীবন, একটি সমাজের বিবর্তন এবং একটি দেশের দীর্ঘ পথচলার অনুরণন। তাই বলা যায়, ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ কেবল একটি স্মৃতিকথা নয়; এটি স্মৃতি, সত্য, সাহস ও মানবিকতার সম্মিলিত জীবনদলিল। বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে, একজন সৎ ও সংবেদনশীল মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা হিসেবে এবং প্রবাসজীবনেও নিজের শিকড় ও পেশার প্রতি অবিচল থাকার এক অনুপ্রেরণাদায়ী আখ্যান হিসেবে ‘স্মৃতির পথে আটচল্লিশ বছর’ দীর্ঘদিন পাঠকের মনে জায়গা করে নেবে।
লেখক পরিচিতি :
মিহিরকান্তি চৌধুরী
লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার সিলেট।